সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৬ পূর্বাহ্ন

শয্যাশায়ী স্ত্রীকে কোলে নিয়ে বৃদ্ধের আকুতি, ‘আল্লাহ আমাকে খাবার দাও’

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রায় ৭০ বছরের সংসার জীবন। এই দীর্ঘ সময়ে অভাব যেন নিত্যসঙ্গী। বয়সকালে কাঁচামালের ব্যবসা করে কোনোভাবে সংসার চালিয়েছেন সাজু শেখ। এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তিনি। স্ত্রী নূরজাহান বেগমও প্রায় ছয় বছর ধরে শয্যাশায়ী। খাবারের কষ্ট, চিকিৎসার অভাব সব মিলিয়ে জীবনের শেষ সময়টা কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে কাটছে তাদের। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও একে অপরকে আঁকড়ে ধরে আছেন তারা।

শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের এই বৃদ্ধ দম্পতিকে নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে মানুষের নজর কেড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে স্ত্রী নূরজাহানকে কোলে নিয়ে কাঁদছেন সাজু শেখ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলতে থাকেন, আল্লাহ আমাকে খাবার দাও, আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগমের সংসারে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। তিন মেয়েরই অনেক আগে বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের কেউ কেউ মাঝেমধ্যে বাবার খোঁজখবর নেন। তিন ছেলের মধ্যে একজন করোনার সময় নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তবে মাঝে মধ্যে তার খোঁজ পাওয়া যায়। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান এবং বছরে দু-একবার বাড়িতে আসেন। সন্তানরাও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটাচ্ছেন।

বৃদ্ধ দম্পতির ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজের সংসারে টানাপোড়েন থাকলেও সাধ্যমতো বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণ ও খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করেন তিনি। তবে দুর্মূল্যের বাজারে নিজের সংসার চালানোই তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক বছর আগে তার স্ত্রীও চিকিৎসার অভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে মা-বাবার প্রয়োজনীয় খরচ বহন করাও তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

এদিকে প্রায় ছয় বছর আগে পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহানের। এরপর থেকেই তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী। অর্থের অভাবে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করাতে পারছেন না স্বামী সাজু শেখ।

বয়সকালে কাঁচামালের ব্যবসা করলেও এখন কাজ করার সামর্থ্য নেই সাজুর। ফলে খাবারের জোগান ও স্ত্রীর চিকিৎসা দুই দিক থেকেই অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।

গত ৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় এক ব্যক্তি তাদের কষ্টের মুহূর্তটি ভিডিও করে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন তাদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন।

সমাজকর্মী শামীম আহমেদ বলেন, জীবনযুদ্ধে মানুষ অনেক সময় দরিদ্রতার কাছে হেরে যায়। আবার কখনো কখনো দরিদ্রতাকে জয় করে। শেরপুরে এমনই এক ৮০ বছর বয়সের বৃদ্ধ দম্পতি রয়েছে, যাদের ভালোবাসার কাছে দরিদ্রতা হেরে গেছে। শুধু তাই নয়, হেরে গেছে শারীরিক অক্ষমতা ও বার্ধক্যজনিত রোগবালাই।

রক্তসৈনিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল আমিন রাজু বলেন, ভিডিওটি নজরে এলে আমি দ্রুত খোঁজখবর নেই। এরপর দেড় মাসের খাবারের জন্য যা যা প্রয়োজন, তা আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সাজু শেখের হাতে তুলে দিয়েছি।

সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটি শেরপুরের সভাপতি আলমগীর আল আমিন বলেন, খবরটি পাওয়ার পর আমরা খোঁজ নিয়েছি। এখন তাদের কাছে মোটামুটি খাবার মজুদ আছে। তবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। স্বামী-স্ত্রী দুজনই নানা রোগে জর্জরিত হয়ে আছেন।

বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরেও এসেছে। শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ভিডিওটি নজরে এসেছে। বৃদ্ধ সাজু শেখ ও নূরজাহান দম্পতির ব্যাপারে যাবতীয় খোঁজখবর নিয়ে নাগরিকদের যেসব সুবিধা দেওয়া যায়, তা তাদের দেওয়া হবে।

প্রায় সাত দশকের সংসারে সুখের স্বচ্ছলতা না এলেও একে অপরের প্রতি টান ও নির্ভরতা হারাননি সাজু-নূরজাহান। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের চাওয়া খুব বেশি নয় দু’বেলা খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আর একে অপরকে পাশে নিয়ে বেঁচে থাকা।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102