একসময় সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসত নীরবতা। ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের আতঙ্কে অন্ধকার হওয়ার আগেই দোকানপাট বন্ধ করে বাড়ি ফিরতেন ব্যবসায়ীরা। পথচারীদের জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনাও ছিল নিত্যদিনের। পীরগঞ্জ-ঠাকুরগাঁও সড়কের সেই ভাতার মারি রেলক্রসিং এলাকাতেই এবার গড়ে উঠছে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস।
সম্প্রতি ভাতার মারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। দীর্ঘদিনের আতঙ্কের এই এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার খবরে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন আশার সঞ্চার।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. ইসরাফিল শাহীন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি শুরু হয়েছে প্রাথমিক প্রশাসনিক কার্যক্রম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাতার মারি রেলক্রসিং এলাকা কয়েক দশক ধরে ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত ছিল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই এ সড়কে মানুষের চলাচল কমে যেত। অন্ধকার নামার পর নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকেই এ পথ এড়িয়ে চলতেন।
মহেষালী গ্রামের ৭০ বছর বয়সী বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন, বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেই ভয়ে এ সড়কে মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। কয়েক যুগ ধরে ডাকাতেরা পথচারীদের জিম্মি করে টাকা-পয়সা ও মালামাল লুট করেছে। তাদের হামলায় কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন, আবার অনেকে পঙ্গুত্বও বরণ করেছেন। এ কারণে সন্ধ্যার পর ভাতার মারি দিয়ে চলাচল করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে ভাতার মারির সেই পুরোনো চিত্র এখন বদলে যাওয়ার প্রত্যাশা স্থানীয়দের। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এলাকায় প্রথম চায়ের দোকান দেওয়া ৪৫ বছর বয়সী মর্জিনা বেগমের কাছেও ভাতার মারির অতীত মানেই আতঙ্কের স্মৃতি। তিনি জানান, ডাকাতের ভয়ে সন্ধ্যা হলেই দোকানের মালামাল গুটিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হতো। এখন ওই এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে—এ খবর তার মনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলে নিরাপদ পরিবেশে নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
স্থানীয়দের ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে ভাতার মারির চেহারাই বদলে যাবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে এলাকা। একই সঙ্গে বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য, তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। বদলে যাবে এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইসরাফিল শাহীন বলেন, শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুরুর লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে ছয়টি বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এসব বিভাগের অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাদ হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত ভাতার মারি এলাকায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেখানে বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।
একসময় যে ভাতার মারি ছিল সন্ধ্যার পর আতঙ্কের নাম, সেখানেই এখন তৈরি হচ্ছে উচ্চশিক্ষার নতুন ঠিকানা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরে শুধু শিক্ষার সুযোগই বাড়বে না, বদলে যাবে এলাকার দীর্ঘদিনের পরিচিতিও। অপরাধ ও আতঙ্কের জায়গা পেরিয়ে ভাতার মারি হয়ে উঠবে শিক্ষা, ব্যবসা ও নিরাপদ জনজীবনের নতুন কেন্দ্র।