সরকার একের পর এক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তা পূরণ হয়নি। বরং আগের অধ্যাদেশ বাতিল করে আরও শক্তিশালী আইন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত দুর্বল আইন করা হয়েছে।
আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরের বিজয়-৭১ চত্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল সংসদে পাসের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগেও এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
এবি যুব পার্টির সদস্য সচিব হাদীউজ্জামান খোকনের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, আমিনুল ইসলাম এফসিএ, আলতাফ হোসেন ও শাহাদাতুল্লাহ টুটুল।
গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার আইন প্রসঙ্গে মঞ্জু বলেন, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠছে, তদন্ত যদি সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশের হাতেই থাকে, তাহলে তা নিছক প্রহসন। গুমের তদন্ত এমন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দিতে হবে, যার কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি কিংবা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের চাপের ভয় থাকবে না।
তিনি বলেন, অতীতে গুমের অসংখ্য অভিযোগ উঠলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনো স্বতঃস্ফূর্তভাবে এর দায় স্বীকার করেনি। তাই গুমের তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।
সরকারের প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে মঞ্জু বলেন, ‘উন্নত আইন দেওয়ার কথা বলে আপনারা জনগণকে ধোঁকা দিয়েছেন। একের পর এক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছেন। মনে রাখবেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, আগামী দিনে তারাও ক্ষমতার বাইরে যেতে পারেন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার নিয়ে করা এই আইন একদিন আপনাদের জন্যই বুমেরাং হবে।’
তিনি আরও বলেন, দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও ভুলে যাওয়া হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে না বলা হলেও কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে। মানুষের আয় না বাড়লেও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে।
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে মঞ্জু বলেন, ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে—এটি তারা বুঝতে পারেন। কিন্তু চাঁদাবাজি বেড়ে যাওয়ার জন্যও কি ইরানের যুদ্ধ দায়ী? সরকার অতীতের পথেই হাঁটছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল প্রসঙ্গে মঞ্জু বলেন, নতুন আইনে ভবিষ্যতে নানা ধরনের জটিলতা ও বিরোধ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দানকৃত সম্পত্তি পরবর্তীতে বিক্রি বা হস্তান্তরের সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে মুসলিম আইন বা শরিয়াহর সঙ্গে কোনো বিধান সাংঘর্ষিক কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া এবং ওলামায়ে কেরামের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন আইন—এই তিনটি আইন পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে।
সমাবেশে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের ভোটে সংসদে গিয়ে যারা ধানক্ষেতে-পাটক্ষেতে ঘুমানোর ইতিহাস দেখেছেন, তারা আজ সেই ইতিহাস ভুলে গেছেন। জিয়া পরিবারের ওপর নির্যাতন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা এবং হাজার হাজার মানুষকে গুম, গুলি ও ক্রসফায়ারের ইতিহাসও তারা ভুলে গেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফুয়াদ বলেন, ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইন আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আইন ফিরিয়ে আনতে হলে আওয়ামী লীগকেও ফিরিয়ে আনা উচিত—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকার ৩১ দফার সঙ্গে বেঈমানি করেছে এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ভুলে যাবেন না, আবারও মুচলেকা দিতে হতে পারে।’ জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় কয়েকটি কলমের খোঁচায় বাতিল করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাবেশে এবি পার্টির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর, ছাত্রপক্ষের সাধারণ সম্পাদক রাফিউর রহমান ফাত্তাহ, মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব বারকাজ নাসির আহমদসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।