রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন

ড্রোন ক্যামেরায় ধরা পড়ল নেপালের তুষারধস, যা ঘটেছিল

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

নেপালের লাংটাং অঞ্চলে ভয়াবহ তুষারধস ও ভূমিধসের ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত দুর্ঘটনাক্রমে ড্রোন ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে। চীনা এক ড্রোনচালকের ধারণ করা ভিডিও এবং চীনা গবেষকদের সংগ্রহ করা নতুন ছবি ও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে মূল শিলাস্তরের ধস থেকেই সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সূত্রপাত।

গত ২৬ আগস্ট সকালে প্রায় ৫ হাজার মিটার উচ্চতায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে আসে। এর ফলে হিমবাহ, নদী ও উপত্যকা এলাকায় একের পর এক ধ্বংসাত্মক ঘটনা সৃষ্টি হয়।

এখন পর্যন্ত নেপালে এই দুর্যোগে প্রায় এক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন হয়েছে বলে জানা গেছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬৭৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের অংশেও প্রায় ৫০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে।

ধসে পড়া ভবন ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেলে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। নেপাল সরকারের পাশাপাশি ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দলও কাজে যোগ দিয়েছে।

দুর্ঘটনাক্রমে ক্যামেরায় ধরা পড়ে ধস

চীনের একটি পর্বতচূড়ার রাডার স্টেশনে অবস্থানরত এক ড্রোনচালক নেপালের সীমান্তবর্তী পাহাড়ের দিকে ড্রোন ওড়ানোর সময় দুর্ঘটনাক্রমে ধসের পুরো দৃশ্য ধারণ করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশ প্রায় মেঘমুক্ত। পেছনে লাংটাং লিরুং—যার উচ্চতা ৭ হাজার ২৩৪ মিটার—এবং কিমশুম (৬ হাজার ৭৮১ মিটার) শৃঙ্গের দৃশ্য। হঠাৎ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সাদা বরফের বিশাল স্রোত নিচে নেমে আসে। এরপর লেন্ধে খোলা উপত্যকার দিকে বাদামি ধুলোর বিশাল মেঘ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

এই দৃশ্য ২০১২ সালের পোখারা-সংলগ্ন সেতি নদীর আকস্মিক বন্যার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় একটি পর্যটকবাহী বিমানের ডানায় থাকা গোপ্রো ক্যামেরায় অন্নপূর্ণা-৪ এলাকার একটি পাথরধসের দৃশ্য দুর্ঘটনাক্রমে ধারণ হয়েছিল। ওই ধসের সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ৭৯ জন নিহত হন।

হিমবাহ নয়, মূল পর্বতই ভেঙে পড়েছিল?

নতুন ড্রোন ফুটেজ ও ছবির ভিত্তিতে গবেষকদের ধারণা, লাংটাং লিরুংয়ের চূড়ার নিচে বরফক্ষেত্রের প্রান্তে থাকা ঝুলন্ত হিমবাহ বহনকারী পাথুরে দেয়ালের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে।

এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, হিমবাহের ওপর জমে থাকা বরফের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার কারণেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত। তবে নতুন ছবি সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

গবেষকদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল শিলাস্তরের একটি বড় অংশই ভেঙে পড়ে এবং এর ওপর থাকা বরফকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিটার নিচে পাহাড়ের পাদদেশে আছড়ে পড়ে। বিপুল পরিমাণ পাথর ও বরফের গতিশক্তি এবং ঘর্ষণের ফলে ধসের উপাদানগুলো দ্রুত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। পরে তা আরও নিচে থাকা বৃষ্টিতে ফুলে ওঠা জল ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে মিশে প্রবল কাদার স্রোত তৈরি করে।

অর্থাৎ, ঘটনাটিকে শুধুমাত্র ‘হিমবাহ ধস’ হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটি মূলত একটি পর্বতধস বা শিলা-বরফ ধস হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

হিমালয়ে এ ধরনের ঘটনা অতীতেও ঘটেছে। ২০১২ সালে অন্নপূর্ণা-৪ এলাকায় এবং ২০১৭ সালে মাকালুর কাছে সালদিম শৃঙ্গে বড় ধরনের পর্বতধসের ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের সময়ও হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধস নেমে লাংটাংয়ের একটি পুরো গ্রাম চাপা পড়েছিল। ওই ঘটনায় প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হন।

কেন ভেঙে পড়ল পর্বত?

এখন বিজ্ঞানীদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন—কী কারণে লাংটাংয়ের উত্তর ঢালের শক্ত শিলাস্তর হঠাৎ ভেঙে পড়ল?

হিমালয় বিশ্বের নবীনতম ও সর্বোচ্চ পর্বতমালা। অঞ্চলটি ভূকম্পনগতভাবে সক্রিয় এবং এর অনেক শিলা ও পর্বতঢাল অত্যন্ত ভঙ্গুর। টেকটোনিক শক্তির কারণে পর্বতগুলো এখনো ক্রমাগত ওপরে উঠছে। ফলে ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল এই অঞ্চলে বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি সবসময়ই রয়েছে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে কি না, সেটিও এখন বিজ্ঞানীদের তদন্তের অন্যতম বিষয়।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের পারমাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত মাটি ও শিলার ভেতরের বরফ গলছে। এই বরফ অনেক ক্ষেত্রে শিলাখণ্ড ও পর্বতের বিভিন্ন অংশকে একসঙ্গে ধরে রাখার ‘প্রাকৃতিক আঠা’ হিসেবে কাজ করে। বরফ গলে গেলে শিলার বন্ধন দুর্বল হয়ে যায় এবং ধসের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

উষ্ণতা ও হিমবাহের পশ্চাদপসরণ

হিমালয়ের হিমবাহগুলো শেষ বরফ যুগের পর থেকেই ধীরে ধীরে পশ্চাদপসরণ করছে। প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে শেষ হওয়া বরফ যুগ এবং প্রায় ৬০০ বছর আগে শেষ হওয়া ক্ষুদ্র বরফ যুগের পর থেকে এই পরিবর্তন অব্যাহত রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে হিমবাহ গলার গতি বেড়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102