রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ কী

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নরম্যান্ডি ল্যান্ডিংয়ের সঙ্গে তুলনা করে একে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ইরানের সমস্ত বৈশ্বিক আর্থিক পথ বন্ধ করে দেওয়া।

ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন ব্যর্থ হওয়ায় প্রাথমিকভাবে ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক যুদ্ধাস্ত্রের ঘাটতি এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধের পথে হাঁটা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অন্য পথ খোলা নেই। ইরান হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে রাখায় জাহাজ চলাচল বিঘ্ন হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো- এই অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে কাবু করতে পারবে কিনা?

 

ইরানের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সহযোগিতা এবং সম্মতি ছাড়া আমেরিকার পক্ষে এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে চীনসহ উপসাগরীয় আটটি দেশ স্পষ্টত জানিয়ে দিয়েছে, তাদের পক্ষে এই অবরোধ মেনে চলা সম্ভব নয়।

ইরানের তেলের সিংহভাগই, প্রায় ৯০ শতাংশ; একাই ক্রয় করে চীন। চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘অবৈধ ও একতরফা’ হিসেবে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইরানের সঙ্গে নিজেদের বৈধ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেইজিং ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, যাতে ইরান পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে। যদিও তারা নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তেহরানকে উদ্ধার করতে যাবে না। ফলে চীনের সহযোগিতা ছাড়া ইরানের আয়ের প্রধান উৎস তেল সরবরাহ বন্ধ করা আমেরিকার পক্ষে সম্ভব নয়।

আমেরিকা হুমকি দিয়েছে যে ইরানের সঙ্গে লেনদেনকারী যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতি চীনের বড় ব্যাংকগুলোর ওপর প্রয়োগ করতে ওয়াশিংটন দ্বিধায় ভুগছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে যখন প্রশ্ন করা হয়, কেন প্রথম নিষেধাজ্ঞার তালিকায় চীনের বড় ব্যাংকগুলোকে রাখা হয়নি, তখন তিনি সরাসরি স্বীকার করেন, ‘‘আমি কেন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে যাব?’’ অর্থাৎ, চীনের মতো বড় অর্থনীতির ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে গেলে খোদ আমেরিকার নিজের এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামবে। ফলে প্রথম তালিকায় ৬০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও কোনো বড় চীনা ব্যাংকের নাম রাখা হয়নি।

আমেরিকার এই চাপের মুখে কিছু দেশ সাড়া দিলেও সবাই কিন্তু সহযোগিতা করছে না। যেমন— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণা দিলেও, ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার তুরস্ক এখনও এই মার্কিন হুমকিতে কোনো সম্মতি বা প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ইরান দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে বাণিজ্য সচল রাখার নানাবিধ কৌশল তৈরি করেছে। তাছাড়া মার্কিন সিনেটর ক্রিস মারফির মতো সমালোচকরা মনে করেন, আমেরিকা ইতিমধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক সামর্থ্য বহুলাংশে হারিয়েছে এবং এই নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো আসলে মূলত এক ধরনের ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ বা লোকদেখানো ঠুনকো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র প্রভাব থাকলেও চীনের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশের সহযোগিতা ছাড়া ইরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা ওয়াশিংটনের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

নিষেধাজ্ঞাগুলো ব্যর্থ হলে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ওয়াশিংটনের ‘জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা’ এবং রাজনৈতিক জবরদস্তির ব্যর্থতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করবে। এটি ব্যর্থ হলে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা ভবিষ্যতে তীব্র সংকটের মুখে পড়বে।

চীন বা অন্যান্য দেশের বড় বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে যদি মার্কিন প্রশাসন সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা বা ডলারের ব্যবহার বন্ধের হুমকি দিতে যায়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। চীনের বড় ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে মার্কিন অর্থনীতিসহ সমগ্র বিশ্বে নজিরবিহীন বৈশ্বিক আর্থিক সংকট তৈরি হওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। আর এই আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত কোনো বড় ব্যবস্থা নিতে না পারে, তবে ডলার-ভিত্তিক বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কর্তৃত্ব ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর আমেরিকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দুর্বল প্রমাণিত হবে।

নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ হওয়া এবং ইরানের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকার অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও ঘাঁটিগুলোর ওপর নিরাপত্তা ঝুঁকি বহাল থাকা। ইতিমধ্যে চলমান দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাস্ত্রের ঘাটতি এবং আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলোর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপরন্তু, ইরান যদি অর্থনৈতিক অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ বা বিঘ্নিত করে, তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে, যা বিশ্ব তেল বাজারে ধস নামাবে এবং পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরও বড় অর্থনৈতিক সংকটে ফেলবে।

মার্কিন একতরফা চাপের মুখেও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, ইরানের সঙ্গে তাদের বৈধ বাণিজ্যিক স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষা করতে তারা ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102