রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কিশোরগঞ্জের যুবক নিহত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত ‘ময়না’ রাত ১টার মধ্যে ৬০ কিমি বেগে ঝড় হতে পারে যেসব এলাকায় কোরবানির জন্য গরু দেখতে গিয়ে নিভে গেল দুই বন্ধুর প্রাণ তিন ঘণ্টার ব্যবধানে সড়কে ঝরল ১৩ প্রাণ নতুন মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক অনলাইন জুয়া-অর্থপাচার চক্রে সিআইডির অভিযান, তিনজন গ্রেপ্তার ঈদে নৌপথে নিরাপদ যাতায়াত ও দুর্ঘটনা রোধে কাজ করছে কোস্ট গার্ড ২ বছরের মধ্যে ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করা হবে : ডিএসসিসি প্রশাসক কোন ফাইলে অনিয়ম হয়েছে তা প্রকাশে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে আসিফ মাহমুদের চ্যালেঞ্জ

আনুগত্য ও আত্মশুদ্ধির মহান ইবাদত

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু ইবাদত আছে, যা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়Ñ বরং মানুষের আত্মত্যাগ, ভালোবাসা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতীক। কোরবানি তেমনই এক মহান ইবাদত। প্রতি বছর পবিত্র জিলহজ মাস এলেই মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে ফিরে আসে সেই আত্মত্যাগের স্মৃতি, ফিরে আসে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর অবিস্মরণীয় কাহিনি।

কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করার শিক্ষা। তাই কোরবানির ইতিহাস যতটা ধর্মীয়, ততটাই মানবিক ও চেতনার ইতিহাস।

আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই কোরবানির সূচনা

কোরবানির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই কোরবানির বিধান চালু হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জাতির জন্যই কোনো না কোনোভাবে কোরবানির বিধান নির্ধারণ করেছিলেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির বিধান দিয়েছি, যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে তার দেওয়া চতুষ্পদ জন্তুর ওপর।’

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, কোরবানি কেবল মুসলিম উম্মাহর জন্য নয়; বরং অতীতের সব আসমানি ধর্ম ও জাতির মধ্যেই এর প্রচলন ছিল। তবে সময় ও জাতিভেদে পদ্ধতির ভিন্নতা ছিল।

হাবিল ও কাবিল : পৃথিবীর প্রথম কোরবানি

কোরবানির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কাহিনি। দুই ভাইয়ের মধ্যে এক বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য আদম (আ.) তাদের আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি দিতে বলেন।

হাবিল ছিল পশুপালক। সে নিজের সেরা ও প্রিয় পশুটি কোরবানি হিসেবে পেশ করল। অন্যদিকে কাবিল ছিল কৃষিকাজে নিয়োজিত। সে নি¤œমানের শস্য কোরবানির জন্য দিল।

আল্লাহ তায়ালা হাবিলের আন্তরিকতা ও তাকওয়া কবুল করলেন, কিন্তু কাবিলের কোরবানি গ্রহণ করলেন না। সেই সময় কোরবানি কবুল হওয়ার একটি বিশেষ নিদর্শন ছিলÑ আসমান থেকে আগুন নেমে এসে কবুল হওয়া কোরবানিকে জ্বালিয়ে দিত।

এই ঘটনা মানবজাতিকে একটি বড় শিক্ষা দেয়Ñ আল্লাহর কাছে বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, বরং অন্তরের নিষ্ঠা ও তাকওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মভেদে কোরবানির ভিন্ন রূপ

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সব ধর্ম ও সভ্যতায় উৎসর্গ বা কোরবানির ধারণা ছিল। কোথাও পশু উৎসর্গ, কোথাও শস্য বা ফলমূল নিবেদন, আবার কোথাও প্রতীকী আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেছে।

তবে ইসলাম কোরবানিকে একটি সুনির্দিষ্ট ও মানবিক রূপ দিয়েছে। ইসলামে কোরবানির উদ্দেশ্য কখনো রক্তপাত নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং মানুষের মাঝে সম্পদের বণ্টন নিশ্চিত করা।

কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে:

‘আল্লাহর কাছে তাদের গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া।’

অর্থাৎ কোরবানির প্রকৃত মূল্য নিহিত মানুষের অন্তরের বিশুদ্ধতায়।

ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) : আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত

বর্তমান মুসলিম বিশ্বের প্রচলিত কোরবানির মূল ইতিহাস জড়িয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর সঙ্গে।

ইবরাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বন্ধু বা ‘খলিলুল্লাহ’। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তিনি সন্তান হিসেবে পেয়েছিলেন ইসমাঈল (আ.)-কে। স্বাভাবিকভাবেই পুত্রের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল সীমাহীন।

একদিন আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নে আদেশ দিলেনÑ নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে কোরবানি করতে হবে। নবীদের স্বপ্ন ছিল ওহির সমতুল্য। তাই ইবরাহিম (আ.) বুঝলেন, তাঁকে তাঁর প্রিয় পুত্রকেই আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবাই করতে হবে।

এ যেন মানবজীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা কিন্তু বিস্ময়করভাবে ইসমাঈল (আ.)-ও পিতার আদেশে সম্মতি জানালেন। তিনি বললেন,

‘হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তা-ই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’

পিতা ও পুত্র যখন আল্লাহর আদেশ পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, ঠিক তখনই আল্লাহ তাদের এই আত্মত্যাগ কবুল করেন। ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে জান্নাতি দুম্বা কোরবানি করা হয়।

এই ঘটনাই আজকের কোরবানির মূল ভিত্তি এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা।

কোরবানি কেবল ধর্মীয় রীতি নয়;

এটি মানুষের নৈতিক ও সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রথমত, কোরবানি মানুষকে ত্যাগের শিক্ষা দেয়। নিজের প্রিয় সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত করে।

দ্বিতীয়ত, এটি ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের শিক্ষা দেয়। কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, কোরবানি মানুষকে আল্লাহভীতি ও আনুগত্যের পথে পরিচালিত করে। ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনা মনে করিয়ে দেয়Ñ আল্লাহর আদেশের সামনে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও আবেগকে বিসর্জন দেওয়াই প্রকৃত ইমানের পরিচয়।

আধুনিক সমাজে কোরবানির তাৎপর্য

আজকের ভোগবাদী সমাজে কোরবানির শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। মানুষ যখন স্বার্থ, প্রতিযোগিতা ও অহংকারে ডুবে যাচ্ছে, তখন কোরবানি শেখায় বিনয়, সহানুভূতি ও আত্মত্যাগের মূল্য।

কোরবানি শুধু উৎসবের আনন্দ নয়; এটি আত্মশুদ্ধিরও উপলক্ষ্য। পশু জবাইয়ের মধ্য দিয়ে মানুষ যেন নিজের ভেতরের হিংসা, লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতাকেও কোরবানি করতে শেখে-এটাই ইসলামের মূল বার্তা।

তাই কোরবানির ইতিহাস শুধু অতীতের কোনো ঘটনা নয়; এটি প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক চিরন্তন আদর্শ। ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগের শিক্ষা যুগে যুগে মানুষকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ধৈর্য ও আনুগত্যের পথ দেখিয়ে যাবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102