গতকাল রোববার (১০ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে ইনকিলাব মঞ্চ। সেখানে সংগঠনটি দাবি করে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে তাদের বহিষ্কারের দাবিও জানানো হয়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে- বাংলাদেশে সত্যিই কি ২৬ লাখ ভারতীয় রয়েছেন?
এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে অন্য কথা। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এক প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিক—৩৭ হাজার ৪৬৪ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের নাগরিক, যাদের সংখ্যা ১১ হাজার ৪০৪।
বিদেশিদের মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগ ভিসায় রয়েছেন ১০ হাজার ৪৮৫ জন, এমপ্লয়ি ভিসায় ১৪ হাজার ৩৯৯ জন, স্টুডেন্ট ভিসায় ৬ হাজার ৮২৭ জন এবং ট্যুরিস্ট ভিসায় রয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৫৬ জন।
২০২০ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত এক জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি কর্মীর সংখ্যা অন্তত আড়াই লাখ।
সংস্থাটির দাবি, এসব বিদেশি কর্মীর মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৩ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়। পাশাপাশি কর ফাঁকির কারণে সরকারের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়।
টিআইবির গবেষণায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশে অন্তত ৪৪টি দেশের নাগরিক বিভিন্ন খাতে কর্মরত রয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছে—ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, নরওয়ে ও নাইজেরিয়া।
বিদেশি এসব কর্মীদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে সবচেয়ে বেশি বিদেশি কর্মী কাজ করছেন।
গত বছরের ২০ জানুয়ারি সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, দেশে তৎকালীন সময়ে ৩৩ হাজার ৬৪৮ জন অবৈধ বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছিলেন।
তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ২৬৬ জন। পরে অভিযান চালিয়ে তা কমানো হয়। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, অবৈধ বিদেশিদের কাছ থেকে ১০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা জরিমানাও আদায় করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক বিদেশি ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কেউ কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে অবস্থান করেন। এভাবেই তৈরি হয় অবৈধ অবস্থানের জটিলতা।
পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসানের মতে, বাংলাদেশে অবৈধ বিদেশি থাকলেও তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়, তবে সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় থাকার দাবি নতুন নয়। এর আগে ২০২৪ সালে এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সাবেক উপদেষ্টা ও অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি পরে একটি টকশোতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালেই প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, উচ্চ বেতনে বাংলাদেশে প্রায় ২৬ লাখ ভারতীয় কর্মরত রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব কর্মীর অনেকের বেতন ডলারে পরিশোধ করা হয় এবং বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স ভারতে চলে যায়।
বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের বৈধতা, কর্মসংস্থান ও অর্থ পাচারের প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায়। তবে ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিকের দাবির পক্ষে এখনো নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান সামনে আসেনি।







