জলবায়ু পরিবর্তন, অস্বাভাবিক আবহাওয়া এবং সম্ভাব্য শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে ২০২৬ সালে বিশ্বের বহু অঞ্চল ভয়াবহ বন্যা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস ও জলবায়ু বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলছে, এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নগর প্লাবনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা, সিলেট বিভাগ ও সীমান্তবর্তী উজান অঞ্চলে ভারি বর্ষণের কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ভারতের আসাম, মেঘালয়, বিহার ও উত্তর প্রদেশে বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও নগর বন্যার মুখে পড়তে পারে। পাকিস্তানেও সিন্ধু অববাহিকায় পাহাড়ি ঢল, ভারি বর্ষণ ও হিমবাহ গলার প্রভাবে নতুন মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডেও অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে জাকার্তা ও ব্যাংককের আশপাশের নিচু এলাকা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
আফ্রিকায় নাইজেরিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাম্বিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নদীর পানি বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি ও কৃষি ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অঞ্চলে বন্যা শুধু অবকাঠামো নয়, খাদ্য উৎপাদন ও মানবিক নিরাপত্তার ওপরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাতেও ঝুঁকি কম নয়। ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পেরু ও ইকুয়েডরের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল এবং যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক ও উপসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা, জোয়ারজনিত প্লাবন ও ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ছে।
ইউরোপে যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি ও বেলজিয়ামে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি ও নগর বন্যার সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে রাইন ও দানিয়ুব নদী অববাহিকায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যা অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য এই বৈশ্বিক দুর্যোগের পেছনে তিনটি বড় কারণ কাজ করছে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো, উষ্ণ বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প জমে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা।
পরিস্থিতি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সংকট ও বৈশ্বিক বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ধান ও গম উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা ২০২৬ সাল হতে পারে জলবায়ু সংকটের এক কঠিন পরীক্ষা। আগাম প্রস্তুতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বহু দেশের জন্য ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।