জেলার সদর, সাটুরিয়া, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলায় কয়েক হাজার কৃষক এখন তামাক চাষের সঙ্গে যুক্ত। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩৫৫ হ্যাক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে।
সদর উপজেলার গড়পাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ উথলী গ্রামের কৃষক মো. কালাম প্রায় দুই দশক ধরে তামাক চাষ করছেন। এ বছর তিনি ১২ বিঘা জমিতে তামাক আবাদ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘তামাক যে শরীরের জন্য ক্ষতিকর, সেটা আমরা ভালো করেই জানি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অন্য ফসলে যে লাভ পাই না তামাকে সেটা পাই। কোম্পানির লোকজন শুরুতেই আমাদের হাতে টাকা তুলে দেয়, বীজ-সার দেয়। ফসল তোলার পর নির্দিষ্ট দিনে তাদের কাছে নিয়ে গেলে বিক্রির চিন্তা থাকে না। এজন্য আমাদের বাজার খুঁজতে হয় না। তাই অনেক ঝুঁকি থাকলেও এই চাষ ছাড়তে পারছি না।’
একই এলাকার আরেক কৃষক আব্দুল মালেক জানান, আমি নিজের তিন বিঘা ও বর্গা নিয়ে আরও সাত বিঘা জায়গায় এবার তামাক চাষ করেছি। বিঘায় গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ গেছে। সব খরচ বাদ দিয়ে বিঘায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভ হবে। তিন থেকে চারটি কোম্পানি আমাদের কার্ড করে দিয়েছে। এগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে আমরা নির্দিষ্ট তারিখে কোম্পানির বায়ারের কাছে নিয়ে যাই। তখন সব যাচাই-বাছাই করে তামাকের মান অনুযায়ী দাম পাই।
সাটুরিয়ার তিল্লী এলাকার কৃষক শহীদ বলেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকেই আমাদের তিল্লী এলাকায় বাপ-দাদাদের তামাক চাষ করতে দেখেছি। আমাদের এলাকার প্রায় প্রত্যেক কৃষকই এই তামাক চাষের সঙ্গে জড়িত। যার দুই ডিসিমেল জমি আছে সেও তামাক করে, যার দুই বিঘা জমি আছে সেও তামাক চাষ করেন। কারণ এ চাষে অন্যান্য ফসলের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ।’
তামাক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাষ তাদের জন্য সহজ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘কোম্পানির লোকজন মাঠে এসে নিয়মিত খোঁজ নেয়। কীভাবে চাষ করতে হবে, সেটাও শিখিয়ে দেয়। অন্য ফসল করলে এত সহায়তা পাওয়া যায় না। তাই অনেকে বাধ্য হয়ে তামাকের দিকে যাচ্ছে।’
তামাক চাষের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগজনক। সাটুরিয়া উপজেলার শ্রমিক রাশেদ মিয়া মৌসুমি ভিত্তিতে তামাকখেতে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তামাক পাতা গাছ থেকে ছেঁড়ার কাজ করতে হয়। তারপর সেগুলো বেঁধে গাড়িতে উঠিয়ে দিতে হয়। বেশিরভাগ সময় হাত-পা জ্বালা করে, শরীর দুর্বল লাগে, মাথা ঘোরে। তবুও কাজ করি, কারণ অন্য কাজ নিয়মিত পাওয়া যায় না।’
আরেক শ্রমিক সাদেক মিয়া বলেন, ‘প্রথমে হাতে গ্লাভস ও মুখে মাস্ক পরে কাজ করতাম। কিন্তু গরমের কারণে বেশিক্ষণ এগুলো ব্যবহার করে কাজ করা যায় না। তাই ঝুঁকি থাকলেও পেটের দায়ে এ কাজ করি।’
একইভাবে কাজ করা স্থানীয় নারী শ্রমিক মুনতাজ বেগম বলেন, ‘তামাক পাতা তুলতে গেলে শরীরে এক ধরনের আঠালো রস লাগে। এতে অনেক সময় বমি ভাব হয়, অসুস্থ লাগে। কিন্তু সংসার চালাতে এই কাজ ছাড়া উপায় নেই। আমাদের এলাকায় এই সময়ে প্রচুর তামাক চাষ হয়। তাই তামাক পাতা বাছাইয়ের কাজ করি। দিন শেষে যা পাই, তা দিয়েই চলতে হয়।’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, তামাক চাষ শুধু কৃষিজমির ক্ষতি করছে না, দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশবাদী বিমল চন্দ্র রায় বলেন, ‘তামাক চাষের কারণে জমির উর্বরতা দ্রুত কমে যায়। ফলে একই জমিতে পরবর্তীতে অন্য ফসল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বাড়ি, আঙিনা কিংবা রাস্তার পাশে দড়িতে ঝুলিয়ে তামাক শুকানোর সময় এর তীব্র গন্ধ আশপাশের বায়ু দূষিত করে। তাই কৃষকদের এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে বিকল্প চাষাবাদে উৎসাহ ও পর্যাপ্ত প্রণোদনা দিতে হবে।’
স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটিও উদ্বেগজনক বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এবিএম তৌহিদুজ্জামান সুমন বলেন, ‘তামাক চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষক ও শ্রমিকরা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। তামাকের গ্যাসীয় উপাদান শ্বাসনালীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, যা দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া তামাক পাতার সংস্পর্শে থাকলে মাথা ঘোরা, বমি ও দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দেয়।’
অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, তামাক চাষ কমাতে তারা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহজাহান সিরাজ জানান, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর তামাক চাষ কিছুটা কমেছে। গত বছর যেখানে ৩৬০ হ্যাক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছিল, এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫৫ হ্যাক্টরে। এই প্রবণতা কমাতে আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তামাকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তামাকের বিকল্প হিসেবে আখ, কলাসহ উচ্চ ফলনশীল ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের একটি নীতিমালাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আগামী কয়েক বছরে তামাকের আবাদ আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। কৃষকরা বলছেন, বিকল্প ফসলের বাজার অনিশ্চিত হলেও তামাক কোম্পানিগুলো নিশ্চিত বাজার ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। ফলে সহজেই কৃষকরা এই চাষে ঝুঁকছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। তামাক কোম্পানির কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি, বিকল্প ফসলের লাভজনক বাজার সৃষ্টি এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে তামাক চাষের এই প্রবণতা কমানো কঠিন হবে।







