বাংলাদেশের আলোচিত ইসলামিক বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারীর অস্ট্রেলিয়া সফরের মাঝেই তার ভিসা বাতিল করেছে দেশটির সরকার। এ ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ভিসা বাতিলের কারণ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বিষয়ে নিজের অবস্থানও পরিষ্কার করেছেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের কাছে ‘অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন আজহারীর অতীত বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি দেয়। অভিযোগে তার কিছু বক্তব্যকে বিভাজনমূলক এবং ঘৃণা উস্কে দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানা গেছে।
এ বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টেও আলোচিত হয়েছে। লিবারেল সিনেটর জোনাথন ডুনিয়াম সিনেটে বলেন, আজহারীর আগমন নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী আগেই সতর্ক করেছিল। তিনি দাবি করেন, মাওলানা আজহারীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভাজনমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ইসলামিক প্র্যাকটিস অ্যান্ড দাওয়াহ সার্কেল (আইপিডিসি)-এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অস্ট্রেলিয়া সফরে আসেন আজহারী। ‘লিগ্যাসি অব ফেইথ’ শীর্ষক বক্তৃতা সিরিজের অংশ হিসেবে ব্রিসবেনে তার কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে মেলবোর্ন, সিডনি এবং ক্যানবেরায় তার বক্তব্য দেওয়ার সময়সূচি নির্ধারিত ছিল। তবে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্তে পুরো সফরসূচি অনিশ্চয়তায় পড়ে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে তিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।
এদিকে বুধবার (১ এপ্রিল) দেওয়া এক অডিও বার্তায় ড. মিজানুর রহমান আজহারী ভিসা বাতিলের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, চলতি সফরে তিনি এখনো কোনো জনসভা বা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেননি। তার ভাষায়, ‘আমি তো এখনও কোনো বক্তব্যই দিইনি। প্রথম ইভেন্ট হওয়ার আগেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, কিছু গণমাধ্যমে এমনভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তিনি অস্ট্রেলিয়ায় এসে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন, যা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। তার মতে, বহু আগের একটি বক্তব্যের খণ্ডিত অংশকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই পুরোনো রেফারেন্স ব্যবহার করেই অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আজহারী অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর প্রতি তার বিদ্বেষ নেই। ‘ইহুদি বা খ্রিস্টানদের প্রতি আমাদের কেন বিদ্বেষ থাকবে? মানবতার দিক থেকে তারা আমাদের ভাই।’ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে তিনি সবসময় কথা বলে আসছেন বলেও উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, তার অবস্থান কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নিজেকে ইহুদি-বিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টাকে ভুল উল্লেখ করে তিনি জানান, যেকোনো জাতি বা দেশের ওপর অন্যায় আক্রমণের বিরুদ্ধেই তিনি অবস্থান নেবেন।
অন্যদিকে, আয়োজক সংগঠন আইপিডিসি জানিয়েছে, নির্ধারিত অনুষ্ঠানগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়নি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মনির হোসাইন জানান, পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে শায়খ আহমাদুল্লাহকে বক্তা হিসেবে আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একাংশ এ সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে আরেক অংশ এটিকে দেশটির আইন ও নিরাপত্তা নীতির স্বাভাবিক প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন বলে মন্তব্য করেছেন।