এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ফ্লাইট ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল ফারুক। তিনি দেশের একটি স্বনামধন্য বেসরকারি বিমান সংস্থায় কর্মরত। দীর্ঘদিনের বিমান চালনার অভিজ্ঞতায় দেখেছেন সাধারণ মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চায় বিমানের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কে। তিনিও সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় দিচ্ছেন পোস্ট অথবা ভিডিও। তেমনি এবার তিনি লিখেছেন, বজ্রপাত হওয়ার সময় এবং হওয়ার পরে কী করেন পাইলটরা?
রূপালী বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য ফ্লাইট ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল ফারুকের সেই তথ্য নিচে হুবুহু তুলে ধরা হল-
আমি ব্যক্তিগতভাবে বজ্রপাতকে এড়িয়ে চলার জন্য চেষ্টা করি। আমার জীবনে অনেকবার বজ্রপাতের সম্মুখীন হই। ইউনাইটেড এয়ার (বিডি) এর ক্যাপ্টেন হিসেবে কলকাতা থেকে উড্ডয়নের পর আমাদের ATR 72-212 উড়োজাহাজকে বজ্রপাতে আঘাত করে। কিছুক্ষণের জন্য প্রায় সব ইন্সট্রুমেন্টই ব্লাইন্ড হয়ে যায়।
শুধুমাত্র কম্পাস, আর্টিফিশিয়াল হরাইজনসহ কিছু কিছু ইন্সট্রুমেন্ট কাজ করতেছিল। সামনের উইনশীল্ডে এমন ভাবে আঘাত করল মনে হচ্ছিল একটি আলোর ঝলকানি। কালবৈশাখীর সময় বাংলাদেশে ফ্লাই করতে হয় খুব সাবধানে। যাত্রার পূর্বেই অপারেশন রুম থেকে আবহাওয়ার বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়। যদি প্রয়োজন হয় আমরা ফ্লাইট ডিলে করি এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে যেকোনো গতিতে ফ্লাই করা যায় না। প্রতিটি উড়োজাহাজের একটি নির্দিষ্ট গতি আছে সেই গতিতে ফ্লাই করতে হয়। প্রয়োজনে অটো পাইলট অফ করতে হয়। সংক্ষেপে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া এখানে সম্ভব নয়।

আকাশে আবহাওয়া দেখার জন্য ওয়েদার রাডার আছে, সেটা দেখে দেখে আমরা ডানে-বামে এটিসি অনুমতি দিয়ে যাতায়াত করি। কখনো কখনো অধিক উচ্চতায় বা নিচে নেমে আসি আবহাওয়াকে এড়ানোর জন্য। আশেপাশের উড়োজাহাজের পাইলটদেরকে আবহাওয়া ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি বিশেষত আমার সামনে যে বিমানটি আছে তার কাছ থেকে। মাঝে মাঝে কালবৈশাখী এতটাই তীব্র হয় যে রুট পরিবর্তন করে অন্য দেশে প্রবেশ করতে হয় অনুমতি নিয়ে। সেই ক্ষেত্রে এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশের জন্য অনেক তথ্য দিতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশকে।
মাঝ আকাশে বিমানে বজ্রপাত হওয়া ভীতিজনক হলেও, আধুনিক বিমানগুলো এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদে থাকার জন্যই ডিজাইন করা হয়েছে। পাইলটরা এই পরিস্থিতি পেশাদারিত্বের সাথে মোকাবেলা করেন।
বজ্রপাতের পর পাইলটরা যা করেন
১. নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ: বজ্রপাতের পর পাইলটরা বিমানের সমস্ত সিস্টেম (যেমন- ন্যাভিগেশন, ইঞ্জিন, ইলেকট্রনিক্স) ঠিকঠাক কাজ করছে কি না তা চেক করেন।
২. এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার (ATC)-কে অবহিত করা: তারা দ্রুত ATC-কে বজ্রপাতের ঘটনা জানান।
৩. ঝড় এড়িয়ে যাওয়া: রাডার ব্যবহার করে বজ্রগর্ভ মেঘ বা ঝড় এড়িয়ে অন্য পথ দিয়ে বিমান নিয়ে যান।
৪. জরুরি অবতরণ (প্রয়োজনে): যদি বজ্রপাতে কোনো বড় ক্ষতি হয়, তবে পাইলটরা নিকটস্থ বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
৫. লগবুকে এন্ট্রি: অবতরণের পর ঘটনার বিস্তারিত লগবুকে লিখে রাখেন, যাতে টেকনিশিয়ানরা পরীক্ষা করতে পারেন।
কেন বিমান নিরাপদে থাকে?
১. ফ্যারাডে কেজ (Faraday Cage): বিমানের ধাতব কাঠামো বা স্কিন বজ্রপাতের বিদ্যুৎকে পরিবাহক হিসেবে কাজ করে বাইরের দিক দিয়ে ছড়িয়ে দেয়, ফলে ভেতরের যাত্রী ও সরঞ্জাম নিরাপদ থাকে।
২. ঝড় এড়িয়ে চলার প্রযুক্তি: আধুনিক রাডার ব্যবহার করে পাইলটরা ঝড় বা মেঘের এলাকা আগেই শনাক্ত করে তা এড়িয়ে চলেন।
সাধারণত, বাণিজ্যিক বিমান বছরে এক থেকে দুইবার বজ্রপাতের শিকার হলেও তা বড় কোনো বিপদের কারণ হয় না।







