রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০২ অপরাহ্ন

হারানো দিনের গ্রামীণ মেলা : শেকড়ের টানে ফিরে দেখা আমাদের লোকজ উৎসব

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

ঢোলের বাড়ি, নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর মাটির সোঁদা গন্ধে যখন চারপাশ মুখরিত হয়, তখন বুঝতে হবে দুয়ারে কড়া নাড়ছে গ্রামীণ মেলা। মেলা মানেই শুধু কেনাকাটা নয়, মেলা মানে মিলন। বাঙালির লোকজ উৎসবের প্রাণভোমরা হলো এই মেলাগুলো। হাজার বছর ধরে গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে আয়োজিত এই মেলাগুলোর পেছনে রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, লোককথা এবং গভীর সামাজিক বন্ধনের গল্প।

বাংলার অধিকাংশ মেলার ইতিহাস কৃষি সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। প্রাচীনকালে যখন মুদ্রার প্রচলন তেমন ছিল না, তখন পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মেলার আয়োজন করা হতো। বিশেষ করে ফসল কাটার পর কৃষকের হাতে যখন নগদ অর্থ আসত, তখন বিনোদন আর কেনাকাটার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠত এই মেলা। অনেক মেলা আবার কোনো পীর-সাধক বা লোকজ দেবতার পুজোকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

মেলার বিশেষ আকর্ষণ

মাটির শিল্প ও কারুকার্য : মেলা মানেই মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা। মাটির তৈরি সরা, পুতুল, হাতি-ঘোড়া আর হাড়ি-পাতিল মেলার প্রধান আকর্ষণ। এর পেছনের কারিগররা বংশপরম্পরায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

নাগরদোলা ও লোকজ গান : মেলায় নাগরদোলা না থাকলে যেন পূর্ণতা পায় না। এর পাশাপাশি থাকে পালাগান, জারি-সারি বা পুতুল নাচের আসর। এই গানগুলোই মূলত বাংলার আদি লোকজ সংস্কৃতির বাহক।

খাবারের পসরা : বিন্নি ধানের খৈ, বাতাসা, কদমা, মুরালি আর চিনির সাজ—এসব খাবার ছাড়া মেলার কথা চিন্তাই করা যায় না। মেলার এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নগুলো আজও শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

সামাজিক মেলবন্ধন ও কুটির শিল্প
গ্রামীণ মেলাগুলো আসলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। বাঁশ, বেত আর শীতলপাটির যে নিপুণ কাজ আমরা মেলায় দেখি, তা তৈরি করেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। মেলা উপলক্ষে দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন একে অপরের বাড়িতে আসে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের ভিড়ে মেলার জৌলুস কিছুটা কমলেও, এর আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। তবে নগরায়ণের ফলে মেলার খোলা জায়গা কমে যাওয়া এবং প্লাস্টিক পণ্যের আধিপত্যে ঐতিহ্যবাহী লোকজ শিল্পগুলো আজ হুমকির মুখে। আমাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এই মেলাগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

মেলা মানেই এক টুকরো বাংলাদেশ। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা হয়তো অনেক কিছু ভুলে যাই, কিন্তু মেলার মাঠের সেই ধুলোমাখা হাসি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কে, আমাদের শেকড় কোথায়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102