শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
সর্বস্তরের মানুষকে অর্থনীতির সুফল দিতে চায় সরকার : অর্থমন্ত্রী বাগেরহাটে ‘স্টার্টআপ সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন শোকেসিং’ প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত রামপালে স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী আইডিয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত বাজেটে দুর্নীতিবাজদের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে : জামায়াত নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হলো বিএসএফ-বিজিবি বৈঠক বাংলা‌দে‌শে এলেন ভার‌তের নতুন হাইকমিশনার হাসপাতাল নয়, আদ্-দ্বীনের প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে : শিশির মনির চ্যালেঞ্জিং সময়ে বাজেট বড় হলেও এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি: আবু হানিফ নভেম্বরে চালু হতে পারে রূপপুরের প্রথম ইউনিট : বিদ্যুৎমন্ত্রী খুলনায় বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা

মায়ের গলিত লাশ, যে প্রশ্নের মুখখোমুখি দাঁড় করায়!

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

ঢাকা শহর প্রতিদিন লাখো মানুষের পদচারণায় থাকে মুখর। সবাই ছুটে চলে নিজের জীবনের লক্ষ্য, দায়িত্ব ও স্বপ্ন পূরণের পথে। কিন্তু এই ব্যস্ততার আড়ালে কখনো কখনো এমন কিছু গল্প হারিয়ে যায়, আবার কখনো তৈরি হয়—যা জীবনের নীরব কান্নার এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাদের তেমনই এক বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

মিরপুরের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে একা বসবাস করতেন ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাটাচ্ছিলেন এক নিঃসঙ্গ জীবন। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে, ওই ফ্ল্যাটের দেয়ালের আড়ালে ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে একটি জীবনের গল্প, একটি সময়ের গল্প।

গত রোববার প্রতিবেশীরা ফ্ল্যাট থেকে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি প্রশাসনকে জানান। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে নূরজাহান বেগমের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাটি মুহূর্তেই এলাকায় শোক ও স্তব্ধতার আবহ তৈরি করে। যে ঘরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, সেটিই যেন তার দীর্ঘ একাকীত্বের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।

নূরজাহান বেগমের জীবন হয়তো সবসময় এমন ছিল না। একসময় হয়তো তারও ছিল ভরা সংসার, সন্তানদের হাসি-কান্নায় মুখর একটি পরিবার ছিল। তার সব সন্তানই আজ প্রতিষ্ঠিত। কেউ সরকারি উচ্চপদে কর্মরত, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আবার কেউ স্কুলশিক্ষক। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সফল পরিবারের গল্প বলেই মনে হয়। মনে হতে পারে, সবাই সুখে-শান্তিতে নিজেদের জীবন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

লোকমুখে শোনা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। স্থানীয়দের মতে, নূরজাহান বেগমের ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনটাই ঘটেছে। দূর থেকে সফল পরিবার মনে হলেও, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই।

স্থানীয়দের ধারণা, সন্তানরা নিজেদের কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় নিমগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। আর সেই ব্যস্ততার ফাঁকেই মা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছেন একাকীত্বের গভীর অন্ধকারে।

হয়তো নিয়মিত ফোনালাপ ছিল, প্রয়োজনীয় খরচ ও চিকিৎসার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এসবই কি শেষ কথা? মানুষের জীবনে মানসিক প্রশান্তি, সঙ্গ এবং আপনজনের উপস্থিতির মূল্য কি তার চেয়ে কম?

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নূরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরেই একা থাকতেন। তাকে খুব কমই বাইরে দেখা যেত। মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীরা খোঁজখবর নিলেও তা ছিল সীমিত পরিসরে।

অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, তারা নিয়মিত মায়ের খোঁজ নিতেন এবং চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছিলেন। ফলে ঘটনাটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

তবে এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজের সামনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। আধুনিক নগরজীবনে প্রবীণ মানুষরা কতটা একাকী হয়ে পড়ছেন? আমরা কি সত্যিই আমাদের বাবা-মায়ের পাশে আছি, নাকি দায়িত্ব পালনের মধ্যেই ভালোবাসার সংজ্ঞাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি?

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। কিন্তু আইনি তদন্তের বাইরেও কিছু মানবিক প্রশ্ন থেকে যায়, যার উত্তর খুঁজতে হবে আমাদেরই।

মিরপুরের সেই নীরব ফ্ল্যাট আজ যেন পুরো সমাজকে একটি বার্তা দিচ্ছে—মানুষের জীবনে শুধু অর্থ, দূর থেকে চিকিৎসা কিংবা দায়িত্ব পালনই যথেষ্ট নয়; কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে একজন মানুষ সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করেন আপনজনের ভালোবাসা, যত্ন ও সান্নিধ্যের জন্য।

আর সেই অপেক্ষা যদি অপূর্ণ থেকে যায়, তবে সেটি শুধু একজন মানুষের নয়, পুরো সমাজেরই এক নীরব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102