বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
পাকিস্তান যেভাবে হোয়াইট হাউসের আস্থা অর্জন করল ভয়াবহ বন্যায় ডুবে যাচ্ছে দেশ, বড় মাপের বিদ্যুৎ বিপর্যয় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কেন এই শত্রুতা? টেলিকম মন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ কোটি টাকায় বালুমহালের ইজারা, ছাত্রদল-বিএনপি নেতার টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন ৩ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো ডা. দীপু মনিকে, পক্ষে দাঁড়াননি কোনো আইনজীবী স্পেনের পর এবার যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিল না ইতালি ভারতের মুর্শিদাবাদে মীর জাফরের ৩৪৬ বংশধরের ‘নাগরিকত্ব’ এখনো বাতিল ইসরায়েলের মৃত্যুদণ্ড আইন: ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে আন্তর্জাতিক নিন্দা জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ আজ

ভূমধ্যসাগরে ডুবে গেল স্বপ্ন

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬
শনিবার (২৮ মার্চ) লিবিয়া থেকে নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার পথে দিক হারিয়ে সাগরে ভাসতে ভাসতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশী অভ্র ফাহিমসহ ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১২ জনের বাড়িই সুনামগঞ্জে। প্রতি বছর নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি জেনেও উন্নত জীবনের আশায় নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায়ই প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। কিন্তু এসব ঘটনায় পাচারকারী, ট্রাভেল এজেন্ট ও দালাল চক্রের সদস্যরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় একটি রাবারের নৌকায় সমুদ্রে ভাসছিলেন অভিবাসন প্রত্যাশীরা। ছয় দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসের উপকূলে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে নৌযানটি ডুবে যায়। এতে নৌকায় থাকা ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে না খেয়ে ছিলেন। গত শনিবার বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা গ্রিসের কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানান। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের মার্চ মাসের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে শুধু ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে রাবারের নৌকায় চড়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করেছেন ৩ হাজার ৩৯৫ জন অবৈধ অভিবাসী। এদের বেশির ভাগই বাংলাদেশ, সোমালিয়া ও পাকিস্তানের নাগরিক।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে অবৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি। এর মধ্যে স্থল ও সমুদ্রপথে গেছেন ৫৮ হাজার ২৯ জন এবং পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে গেছেন ৩৯ হাজার ৮০৩ জন।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত জীবন ও আর্থিক সচ্ছলতার আশায় ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশিদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। বর্তমানে ইউরোপমুখী হওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে না পারাও একটি বড় কারণ বলে তারা মনে করেন।

ভুক্তভোগী পরিবার ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমেরিকা বা ইউরোপে নেওয়ার কথা বলে টারজান ভিসার প্রলোভন দেখায় মানবপাচার চক্র। দালালরা প্রথমে ফ্রি ভিসার মাধ্যমে দুবাই বা দোহাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে অভিবাসন প্রত্যাশীদের লিবিয়ায় নিয়ে যায়। কেউ কেউ কাতার হয়ে দালালের মাধ্যমে তুরস্কে যায়। কখনো পাচারকারীরা কলকাতা, মুম্বাই, দুবাই, মিশর ও বেনগাজি হয়ে ত্রিপোলিতে নিয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে দক্ষিণ সুদানের মরুভূমি পাড়ি দিয়েও লিবিয়ায় নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় গাদাগাদি করে তাদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের পথে পাঠানো হয়। এ সময় পাচারকারী চক্র পাশবিক নির্যাতন করে তার ভিডিও ধারণ করে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে। কারো স্বজন টাকা দিতে না পারলে তাদের হত্যা করে লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জানুয়ারি ভারতে পাচারের শিকার ১৬ জন বাংলাদেশি কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ শেষে দেশে ফিরেছে। ফরিদপুরের দুই যুবককে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় এবং ৩১ জানুয়ারি তাদের লাশের ছবি পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। গত বছরের ২৮ অক্টোবর ট্যুরিস্ট ভিসায় রাশিয়ায় পাঠিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হলে দুই বাংলাদেশির একজন নিহত হন। শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, রোহিঙ্গাদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পাচার করছে দালাল চক্র। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে দেড় শতাধিক রোহিঙ্গাকে ট্রলারে তোলা হলে তাদের আটক করে নিরাপত্তা বাহিনী।

শম্বুকগতিতে চলে মামলা-বিচার : মানবপাচারের মামলার বিচার ও শাস্তি কার্যকর হয় অত্যন্ত ধীরগতিতে। এসব মামলায় শাস্তির নজিরও খুব কম। সূত্র মতে, ২০২৪ সালের প্রথম ১০ মাসে মানবপাচারের ৩৩৬টি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৯টি মামলায় ৫০ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। বাকি ৩১৭টি মামলায় খালাস পেয়েছে ১ হাজার ১৭৮ জন আসামি।

অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, আশির দশক থেকেই বৈধ ও অবৈধ পথে বাংলাদেশ থেকে ইতালি, গ্রিস ও স্পেনে মানুষ যাচ্ছে। এদের বেশির ভাগই তরুণ, যারা ঝুঁকি জেনেও এই পথে পা বাড়ায়। তিনি বলেন, দালাল চক্র শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, যা একা বাংলাদেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে সচেতনতা বৃদ্ধি সবচেয়ে জরুরি। সরকারিভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো প্রয়োজন। তার মতে, ২০২৪ সালে শুধু ইতালিতেই বৈধ ও অবৈধভাবে গেছেন প্রায় ১৪ হাজার বাংলাদেশি এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজারে।

জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দীন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, সম্প্রতি সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার সময় নৌকাডুবির ঘটনায় কিছু বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে, যা সিআইডির নজরে এসেছে। সিআইডির মানবপাচার প্রতিরোধ সেলের একটি দল নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা কীভাবে এবং কার মাধ্যমে পাচারের শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। এ ঘটনায় মামলা করার বিষয়েও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। তবে গতকাল পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা মামলা দায়ের হয়নি।

তিনি আরও বলেন, দেশি-বিদেশি একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে মানবপাচার করে আসছে। তারা ট্যুরিস্ট ভিসার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের সন্তান বা বেকার যুবকদের ইতালি, গ্রিস, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাচার করে। জনপ্রতি ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় চুক্তি করা হয়। অনেক সময় পাচারের শিকার ব্যক্তিরা ঝুঁকি জেনেও নিজেরাই এই পথে যায়, ফলে তারা মামলা করতে চায় না। এতে সিআইডির পক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, মানুষের জীবনের মূল্য কোনো অর্থ বা সম্পদের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তিনি জানান, কেউ যখন স্বেচ্ছায় অবৈধ পথে বিদেশে যায়, তখন সরকারের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। নিহত ১৮ বাংলাদেশির বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মিশন ইতোমধ্যে গ্রিসের কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সহায়তায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহযোগিতা এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উপায় খোঁজা হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102