হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান সংকটের মধ্যেই তেল বিক্রি থেকে দৈনিক প্রায় ১৩৯ মিলিয়ন ডলার আয় করছে ইরান। পাশাপাশি প্রণালি অতিক্রমকারী কিছু বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি আরোপ করেও অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন করছে দেশটি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেল বিক্রি করে ইরান কয়েকশ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রণালি ব্যবহার করতে সক্ষম একমাত্র প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ইরান উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেলের দামের ওঠানামা থেকেও ইরান দ্বিগুণ সুবিধা পাচ্ছে। দেশটির প্রধান অপরিশোধিত তেল ‘ইরানিয়ান লাইট’, যা মূলত চীনের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি হয়, তা ব্রেন্ট ক্রুডের তুলনায় গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট তেলের দাম বোমা হামলা শুরুর পর ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে।
বর্তমানে ইরানের তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী দৈনিক প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেলের কাছাকাছি রয়েছে। দেশটির তেলবাহী জাহাজগুলো খার্গ দ্বীপ টার্মিনাল থেকে তেল বোঝাই করে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগর ত্যাগ করছে, এবং সাম্প্রতিক সময়ে এই কার্যক্রম আরও বেড়েছে।
ইরানের এই ধারাবাহিক রপ্তানি কার্যক্রম উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোর পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত। যুদ্ধের কারণে এসব দেশের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ইরাক ও কুয়েত উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, আর সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব বিকল্প রপ্তানি পথ খুঁজছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলার মধ্যেও ইরান তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে। তেলের দামের ওপর যুদ্ধের প্রভাব কমাতে ওয়াশিংটন সমুদ্রে অবস্থানরত বিপুল পরিমাণ ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার মতো পদক্ষেপ নেয়, যা ইরানের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করে।
কলাম্বিয়ার সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির সিনিয়র গবেষক রিচার্ড নেফিউ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ করে দিচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম ইরানের তেল বিক্রি বন্ধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হবে।
ট্যাংকার ট্রাকার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ইরান প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৯ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা ফেব্রুয়ারির ১১৫ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে ব্রেন্টের তুলনায় ইরানের তেলের মূল্যছাড় কমে ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ১০ ডলারে নেমে এসেছে, যা প্রায় এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এদিকে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইরানের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে নিয়মিতভাবে বড় আকারের তেলবাহী জাহাজ নোঙর করছে। মার্চ মাসের বিভিন্ন সময়ে সেখানে একাধিক সুপারট্যাঙ্কার তেল বোঝাই করতে দেখা গেছে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত জাস্ক টার্মিনাল থেকেও ইরান তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে, যদিও সেখান থেকে রপ্তানি তুলনামূলকভাবে অনিয়মিত।
যুদ্ধ চলাকালে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপরীতে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতির ফলে উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হবে। তবে পরে তিনি ইরানের সঙ্গে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ চলছে বলে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, ইরানি কর্মকর্তারা এ ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছেন।