রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন

মশার যন্ত্রণায় গাজীপুর সিটিবাসী ‘অতিষ্ঠ’

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ সিটি কর্পোরেশন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন। সাতান্নটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ২২৯.৫৩ বর্গকিলোমিটারের এই মহানগরীতে প্রায় ২৭ লাখ মানুষের বসবাস। শীতের মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ডে মশার উপদ্রব মারাত্মকভাবে বেড়েছে। মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন নগরবাসী। দিনের বেলায়ও মশারি টানিয়ে বা কয়েল জ্বালিয়েও থাকতে হচ্ছে মানুষকে।

মশক নিধনে সিটি কর্পোরেশনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। তবে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এখন মশার প্রজনন মৌসুম- এ সময়ে মশার উপদ্রব বাড়া স্বাভাবিক। মশা নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করে যাচ্ছে।

২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজ গেট এলাকায় দুই সন্তান নিয়ে বাস করেন সরোয়ার হোসেন জিও। তিনি বলেন, ‘দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই মশার কামড় খেতে হচ্ছে। ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। বিশেষ করে সন্ধ্যায় ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির সামনের রাস্তায় বা গলিতে দাঁড়ালে মনে হয় মশা উড়িয়ে নিয়ে যাবে। মৌমাছির মতো চারদিক থেকে ঘিরে ধরে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শরীরে মশা বসলে টের পাই, মারতে পারি। কিন্তু বাচ্চাদের নিয়ে বিপাকে পড়েছি। মশারি টাঙিয়ে বা কয়েল জ্বালিয়েও কাজ হচ্ছে না। প্রতিদিনই দেখি ছেলেদের শরীর মশার কামড়ে লাল হয়ে থাকে। গত এক বছরে আমাদের এলাকায় একদিনও মশার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি। সিটি কর্পোরেশনের মশা নিধনের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। কোনো তদারকিও নেই। বুঝতে পারছি না, কী করছে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ।’

সালনা এলাকার খোরশেদ আলম বলেন, ‘শীত শেষ। বাসায় ফ্যান চালিয়ে মশার কামড় থেকে বাঁচার চেষ্টা করি। কিন্তু রাতে তাপমাত্রা কমলে ফ্যান বন্ধ রাখলেই চারদিকে মশার ভনভন শুরু হয়। এত পরিমাণ মশা যে অনেক সময় নাক-মুখে এসে বসে। সন্ধ্যা হলেই দুই মেয়েকে মশারির ভেতর ঢুকিয়ে দিই। কিন্তু দিনের বেলায় ঠিকই কামড়ে নাজেহাল করে। কয়েল জ্বালালে ধোঁয়ায় বাচ্চাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে। মেয়েরা ঠিকমতো পড়াশোনাও করতে পারছে না।’

মিরেরগাঁও এলাকার বৃদ্ধ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মশার যন্ত্রণায় আমরা নগরবাসী এখন দিশেহারা। নগরীতে বসবাসকারী ধনী-গরিব সবাই মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। নিচতলায় যেমন মশা, তেমনি হাইরাইজ ভবনেও উপদ্রব বেড়েছে। মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ নগরবাসী।’

নগরবাসীর অভিযোগ, একদিকে এডিস মশার কামড়ের আতঙ্ক, অন্যদিকে কিউলেক্স মশার যন্ত্রণায় অফিস, বাসাবাড়ি বা দোকানপাট- কোথাও স্বস্তি নেই।

বাসিন্দারা বলছেন, সিটি কর্পোরেশনে মেয়র নেই, কাউন্সিলর নেই। জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশক নিধন কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। আগে মাসে একবার মশা মারার ওষুধ ছিটালেও এখন জয়দেবপুর শহরের বাইরে কোথাও মশক নিধন কর্মীদের দেখা যায় না। যদিও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, মশা নিধন কার্যক্রমে সিটি কর্পোরেশনের গাফিলতি, কার্যকর ওষুধ ব্যবহার না করা, ঠিকমতো ওষুধ না ছিটানো এবং মশার প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করতে না পারার কারণেই উপদ্রব বাড়ছে। বর্তমানে এডিস মশার উপদ্রব কিছুটা কমলেও কিউলেক্স মশা বহুগুণ বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিউলেক্স মশা শুধুমাত্র ওষুধ ছিটিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করে লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। এ ক্ষেত্রে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা যেতে পারে।

গত দুই মাসে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৯১ জন (১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত)। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩.৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৬.১ শতাংশ নারী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) প্রতিবছর এডিস মশা নিয়ে জরিপ করে থাকে। নির্দিষ্ট এলাকায় এডিস মশার লার্ভার পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় জরিপের ব্রেটো ইনডেক্স (বিআই) থেকে।

আইসিডিডিআরবি-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গু সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। আইসিডিডিআরবি ও আইইডিসিআর-এর গবেষণা অনুযায়ী, সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশার ব্রেটো ইনডেক্স ২০-এর উপরে, যা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি নির্দেশ করে। এখানে এডিস অ্যালবোপিকটাস ৭৬.৪ শতাংশ এবং এজিপ্টি ২৩.৬ শতাংশ; উভয় প্রজাতিই সক্রিয়। ফলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘একসময় শুষ্ক মৌসুমে মশার আতঙ্ক ছিল। এখন সারাবছরই এডিস ও কিউলেক্স মশার আতঙ্কে থাকতে হয়। মশার চরিত্র বদলে গেছে। ফলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেশে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। দেশে প্রায় ১২৬ প্রজাতির মশা রয়েছে। শীতের শেষের দিকে কিউলেক্স মশা বাড়ে। এ মশা জন্মায় নালা, নর্দমা, ডোবা ও পচা পানিতে। সিটি কর্পোরেশনের যথাযথ কার্যক্রম না থাকায় এসব স্থান থেকে কিউলেক্সের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ সময় তাপমাত্রার ওঠানামা, দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়া এবং শীতকালসহ বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে কাজ করায় মশার প্রজননক্ষমতা বাড়ে। তবে মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে এক করে ফেললে হবে না। কিউলেক্স ও ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আলাদা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। পদ্ধতিগতভাবে এগোতে না পারলে মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’

তিনি সিটি কর্পোরেশনকে জরুরি ভিত্তিতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং জনগণকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের ডা. মোহাম্মদ রহমত উল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102