ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বলে দেশটিতে আবারও সামরিক হামলার আয়োজন করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে, তেহরান ওয়াশিংটনের যেকোনো হামলার ‘তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী’ প্রতিশোধের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে’ পাল্টা হামলার প্রস্তুতি রয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর।
সামরিক ব্যবস্থা ছাড়াও, ইরানের প্রতিশোধ নেওয়ার একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ, যেখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক পঞ্চমাংশ-অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এবং প্রচুর পরিমাণে তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই পথটি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটবে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি একদিকে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যদিকে ইরানের মাঝে অবস্থিত। অতীতেও ইরান বেশ কয়েকবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে, তবে তারা কখনোই সেই হুমকির বাস্তব প্রতিফলন ঘটায়নি।
হরমুজ প্রণালি আসলে কী?
হরমুজ প্রণালি একদিকে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যদিকে ইরানের মাঝে অবস্থিত। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া, যেখানে জাহাজ চলাচলের পথটি উভয় দিকে মাত্র তিন কিলোমিটার প্রশস্ত। ফলে এটি যে কোনো হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরান অতীতেও বহুবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিলেও তা কখনো কার্যকর করেনি। ইরানের প্রেস টিভির তথ্যমতে, প্রণালিটি বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে। যদিও পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপের সমর্থন পাওয়া গেছে, তবে এটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ইরানের সামনে অনেক বিকল্প খোলা রয়েছে।
বাস্তবে এই অবরোধ কীভাবে কাজ করবে?
ইরান হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন স্থাপন করার চেষ্টা করতে পারে। এছাড়া দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনী বা রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস উপসাগরে বিদেশি জাহাজ আটক বা হামলা চালাতে পারে। ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উভয় দেশ একে অপরের বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছিল, যা ‘ট্যাঙ্কার ওয়ার’ নামে পরিচিত।
ইতিমধ্যে সমুদ্রের নিচে থাকা নিজেদের মিসাইল সুড়ঙ্গ উন্মোচন করেছে ইরান। ধারণা করা হচ্ছে, এসব সুড়ঙ্গে কয়েকশ ক্রুস মিসাইল রয়েছে। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি ইরানের ওপর কোনো হামলা হয় তাহলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ‘নিরাপদ’ থাকবে না।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে যা হতে পারে
গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই কেনে চীন। এই পথ বন্ধ হলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে।
তবে ইতিহাস বলছে, বিশ্ববাজারে তেলের এই ধরনের বড় সংকটগুলো সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ কিংবা ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের সময় তেলের দাম লাফিয়ে বাড়লেও কয়েক মাসের মধ্যেই তা আগের অবস্থায় ফিরে এসেছিল।