শেষ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে বিজেপির কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর এরই মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় পরাজয়ের মুখোমুখি হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু রাজ্যের ক্ষমতাই নয়, নিজের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুর কেন্দ্রও হাতছাড়া হয়েছে তার। বিজেপির এই উত্থানে হঠাৎই বদলে গেছে বাংলার রাজনৈতিক চিত্র। এমন পরিস্থিতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- মমতার পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আপাতত দুটি পথই খোলা রয়েছে মমতার সামনে। এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের সেই বিশ্লেষণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো—
১৯৯৯ সাল। সংসদে দাঁড়িয়ে লালু প্রসাদ যাদব বলেছিলেন, ‘মমতা খুব শক্তিশালী। উনি সাধারণ মানুষ নন।’ অনেকেই সেই কথা আবার মনে করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসক বা মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকায় মমতার কাজ নিয়ে মানুষের দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু শক্তিশালী বিরোধী নেত্রী ও আন্দোলনকারী হিসেবে তাঁর যে ক্যারিশমা, তা ভারতে খুব কম রাজনীতিবিদেরই আছে। মমতার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর হার না-মানা মানসিকতা।
অনেকেই তাই মনে করছেন, এই বড় ধাক্কার পর আবার নতুন করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে পারেন তিনি।
তবে আপাতত সবচেয়ে বড় সমস্যা একটাই—মমতা আর বিধায়ক নন। ভবানীপুরে হারের ফলে তিনি বিধানসভায় জায়গা পাবেন না। ফলে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকতে তাঁকে দ্রুত কোনো নির্বাচনে জিততে হবে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মমতা এবার লোকসভার পথে হাঁটতে পারেন।
অনেকের মতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলায় দলের দায়িত্ব দিয়ে নিজে জাতীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হতে পারেন। দিল্লিতে বিরোধী শিবিরকে একজোট করার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নিতে পারেন মমতা। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিবিরোধী জোট রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সে ক্ষেত্রে ডায়মন্ড হারবারের মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি থেকে লোকসভা উপনির্বাচনে লড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। দিল্লির রাজনীতি হাতের তালুর মতো চেনেন মমতা। ১৯৮৪ সালে যাদবপুর থেকে বর্ষীয়ান বাম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। পরে দীর্ঘ সময় সাংসদ ছিলেন। রেলমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও সামলেছেন।
আরেকটি সম্ভাবনার কথাও উঠে আসছে। তা হলো, বাংলাতেই থেকে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে দাপুটে বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় ফেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলন, প্রতিবাদ ও বিরোধিতার চরিত্রেই সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ মমতার। বাম আমলে লাগাতার আন্দোলন ও অনশনের মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি হয়েছিল।
বিজেপি সরকার এবার বাংলায় মহিলাদের মাসিক আর্থিক সহায়তা, বেকার যুবকদের ভাতা, সিঙ্গুর, সুন্দরবন ও দার্জিলিংয়ে উন্নয়নের মতো একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতা সেই প্রতিশ্রুতিগুলোকে সামনে রেখেই সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
তৃণমূল ক্ষমতা হারালেও দলের বিশাল সংগঠন এখনো অটুট। সেই সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের রাজনীতিতে আবার জোর দিতে পারেন মমতা। এমনিতেও, মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনও আন্দোলনের পথ ছাড়েননি তিনি। ফলে স্বচ্ছন্দেই সেই ভূমিকায় ফিরতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে বলতে গেলে রাজনৈতিক জীবনের এক কঠিন মোড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়ে মমতা। সামনে দুটি পথ—দিল্লির জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নেওয়া, অথবা বাংলায় ফের রাস্তায় নেমে লড়াই শুরু করা।