রেকর্ড উৎপাদন এবং তুলনামূলক কম দামের কারণে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (এইচ১) যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্রাজিল থেকে সয়াবিন আমদানিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে চীন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলবীজ আমদানিকারক দেশটি দক্ষিণ আমেরিকার প্রভাব আরও জোরালো করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বাণিজ্য সূত্র জানায়, ব্রাজিলে সয়াবিন কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় চীনের বেসরকারি তেলকলগুলো ফেব্রুয়ারি থেকে সরবরাহের জন্য ব্রাজিলীয় সয়াবিনের চুক্তি চূড়ান্ত করছে। এর ফলে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং দাম কমেছে। এতে করে সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া উত্তর আমেরিকার রপ্তানি মৌসুমে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সীমিত ক্রয়
গত অক্টোবরের শেষ দিকে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হওয়ার পর চীন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন কিনেছে। তবে এই কেনাকাটা পুরোপুরি করেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিনোগ্রেইন ও কোফকো। তুলনামূলক বেশি দামের কারণে বেসরকারি আমদানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন থেকে দূরে অবস্থান করছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের ওপর চীনের শুল্কহার ১৩ শতাংশ, অন্যদিকে ব্রাজিলীয় সয়াবিনে শুল্ক মাত্র ৩ শতাংশ। এ কারণে দামের প্রতিযোগিতায় ব্রাজিল অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীনবিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াং বলেন, “এপ্রিল মাসে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের আগে রাজনৈতিক পরিবেশ ইতিবাচক রাখতেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে সীমিত পরিমাণ সয়াবিন কেনা হচ্ছে। বৈঠকের পর শুল্ক কমলে কেনাকাটা কিছুটা বাড়তে পারে, তবে পরিমাণ খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
ব্রাজিলীয় সয়াবিনে সুবিধা
ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মতে, মার্চ থেকে জুনের মধ্যে ব্রাজিল থেকে পাঠানো সয়াবিনের ‘ক্রাশ মার্জিন’ অনুকূলে থাকায় চুক্তির পরিমাণ বাড়ছে। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এই সময়ে ব্রাজিলের সয়াবিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক সস্তা। ফলে গত বছরের তুলনায় মার্চ থেকে জুন সময়ে চীনে রপ্তানি বাড়বে।’
নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে চীনে পাঠানোর জন্য ব্রাজিলীয় সয়াবিনের দাম ছিল প্রতি মেট্রিক টন ৫০৭ দশমিক ৯০ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গালফ অঞ্চল থেকে দাম ছিল ৫১৬ দশমিক ৯০ ডলার এবং প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট থেকে ৫১০ দশমিক ৫০ ডলার (শুল্ক বাদে)। এই দামে যদি ১ কোটি ২০ লাখ টন সয়াবিন কেনা হতো, তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে চীনের অতিরিক্ত খরচ পড়ত প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ থেকে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
দক্ষিণ আমেরিকায় বাম্পার ফলন
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় সম্ভাব্য বাম্পার ফলনের কারণে সামনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন করে বড় কোনো বুকিং হওয়ার সম্ভাবনা কম। ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলের শস্য দালাল অ্যাডেলসন গাসপারিন বলেন, ‘আমাদের বড় ফসলের কারণে দাম যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম থাকবে, অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।’
ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো ব্রাজিলীয় সয়াবিন যুক্তরাষ্ট্রের গালফ অঞ্চলের তুলনায় প্রতি বুশেলে অন্তত ৫০ সেন্ট সস্তা। মার্চে এই পার্থক্য বেড়ে ৭৫ সেন্ট পর্যন্ত হতে পারে। ফসল তোলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ড্যান বাসে।
অ্যাগ্রোকনসাল্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫/২৬ মৌসুমে ব্রাজিলের সয়াবিন উৎপাদন রেকর্ড ১৮ কোটি ২২ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। রাবোব্যাংকের বিশ্লেষক মার্সেলা মারিনি ধারণা করছেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে চীন ব্রাজিল থেকে প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ টন সয়াবিন আমদানি করবে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬০ লাখ টন বেশি।
ইতোমধ্যে চীন সেপ্টেম্বর থেকে আগস্ট মেয়াদের জন্য ৪ কোটি ২০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৪০ লাখ টন ব্রাজিলীয় সয়াবিন ক্রয় করেছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্টের জন্য রয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ টন।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনে শূকরের সংখ্যা এখনও বেশি থাকায় সয়ামিলের চাহিদা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে শক্তিশালী থাকবে। ২০২৪/২৫ অর্থবছরে চীন মোট ১০ কোটি ৯৩ লাখ ৭০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি করেছিল। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫/২৬ অর্থবছরে এই আমদানি কমে ৯ কোটি ৫৮ লাখ টনে নেমে আসতে পারে।
এরই মধ্যে আগামী এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর এবং ২০২৬ সালের শেষ দিকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের ঘোষণায় সয়াবিন বাণিজ্য আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।