বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘যে দলে ৩৯ জন এমপি প্রার্থী ঋণখেলাপি, তারা কখনোই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে না। অন্তত ওই দলের মুখে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা মানায় না। চোর-ডাকাতদের সংসদে নিয়ে গিয়ে চোর-ডাকাতমুক্ত দেশ গড়া যায় না। দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের দিয়ে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে বিজয়ী করে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব জাতিকে সঠিক পথ দেখানো এবং ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ৫৪ বছরে যারা পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে, তারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনাও গ্রহণ করতে পারেনি। এর ফলে যুব সমাজের একটি বড় অংশ বিপথগামী হয়েছে। তারাই আজ চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, লুটপাট ও দখলদারিত্বে জড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠনের সুযোগ পেলে রাষ্ট্র সামাজিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। আমাদের আগামীর পরিচয় হবে—‘আমিই বাংলাদেশ’। সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং কর্মের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ১৯৪৭ সালে আমরা ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা ভোগ করতে পারিনি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীন হয়েও স্বাধীনতা পাইনি। চব্বিশে আমরা আধিপত্যবাদের দোসর ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি, আর কোনো ফ্যাসিবাদ আমরা দেখতে চাই না। জুলাই কারও একার নয়—জীবন দেবো, কিন্তু জুলাই দেবো না। জুলাই আন্দোলনে কোনো একক মাস্টারমাইন্ড ছিল না; এ দেশের ১৮ কোটি মানুষই ছিল জুলাইয়ের মাস্টারমাইন্ড।
তিনি আরও বলেন, আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী, কিন্তু কাউকে আমাদের প্রভু হতে দেব না। কেউ যদি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর চেষ্টা করে, তবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। সমাজ পরিবর্তনে যুব সমাজকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আগামীর নেতৃত্ব দেবে তরুণ প্রজন্ম। জামায়াতে ইসলামী তরুণদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ক্ষমতায় গেলে বেকার ভাতা দিয়ে বেকারত্বের মহাসাগর সৃষ্টি না করে যুব সমাজকে দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, যুব সমাজই হবে আগামীর বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
দেশের জনগণ এক জালিমকে বিদায় করে আরেক জালিমের হাতে দেশ তুলে দিতে চায় না উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম জীবনে একবারও ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে আর কাউকে জনগণের ভোট নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। কেউ ভোটাধিকার কেড়ে নিতে বা ভোট চুরি করতে চাইলে তা প্রতিহত করতে হবে। জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং মানুষের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য আজও পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, দেশবাসী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনব্যবস্থা দেখেছে। বিএনপি সরকারের সময়ে মন্ত্রীদের মধ্যে কেবল তিনি নিজে, জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ দুর্নীতির দায়ে কারাগারে যাননি। যারা ক্ষমতায় থেকেও এক পয়সা দুর্নীতি করেনি, তাদেরই এবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আনা প্রয়োজন। তাহলেই দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় বিএনপির মহাসচিব বলেছেন—এই আন্দোলনের সঙ্গে তাদের দলের কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ তারা বর্তমান পরিস্থিতি চায়নি; তারা চেয়েছিল হাসিনা ক্ষমতায় থাকুক। কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ দেশবাসীকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করে মোদির সেবাদাস দল ও নেতাদের বয়কট করার আহ্বান জানান।
১১ দলীয় জোট সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান বলেন, গত ৫৪ বছর ধরে ঢাকা-৬ এলাকার জনগণ নিয়মিত ট্যাক্স ও ভ্যাট দিয়ে এসেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছ থেকে তেমন কিছু পায়নি। ঢাকা-৬ বর্তমানে চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এই এলাকা থেকে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ ও দখলদারদের নির্মূল করে পুরান ঢাকাকে আধুনিক ঢাকা হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি ডা. শফিকুর রহমানের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
১১ দলীয় জোট সমর্থিত শাপলা কলি প্রতীকে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নাসীরুউদ্দীন পাটোওয়ারী বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই গণতান্ত্রিক পথে দেশের নতুন যাত্রা শুরু হবে। তিনি বলেন, যারা নতুন করে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়, যারা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে চায় এবং যারা বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করতে চায়—তারাই সংস্কারের বিপক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে চাইবে না। যারা বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে খুনি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে সহযোগিতা করছে, তারা কখনো বন্ধু রাষ্ট্র হতে পারে না। তিনি ঢাকা-৬ এলাকার জনগণের উদ্দেশে বলেন, চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি থেকে মুক্তি পেতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিন। ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ থেকে সব অপকর্ম নির্মূল করা হবে। তিনি বলেন, খোকা পুত্রের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে হবে এবং জমিদারি প্রথা উপড়ে ফেলতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি মানুষ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এবং ইনসাফের পক্ষে রায় দেবে। সারা দেশের মানুষ জেগে উঠেছে। তরুণ প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রমাণ করেছে—যাদের কথা ও কাজে মিল আছে, তারাই নির্বাচিত হয়। যাদের কথা ও কাজে মিল নেই, শিক্ষার্থীরা যেভাবে তাদের বয়কট করেছে, জাতীয় নির্বাচনেও জনগণ সেভাবেই বয়কট করবে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা-৬ আসন কমিটির পরিচালক কামরুল আহসান হাসানের সভাপতিত্বে ধুপখোলা মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা জহিরুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির উদ্দিন, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, জুলাই শহীদ জুনায়েদের পিতা শেখ জামাল হোসেন, জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, ওয়ারী থানা পূর্ব থানা আমির মোতাসিম বিল্লাহ, সূত্রাপুর দক্ষিণ থানা আমির দাইয়্যান সালেহীনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং ঢাকা-৬ আসনের সব থানা ও বিভাগীয় দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ জনসভায় উপস্থিত ছিলেন।