স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার আরেক ‘শুটার’কে পুলিশ গ্রেপ্তারের কথা জানালেও অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি নিচ্শিত করতে পারেনি পুলিশ।
যদিও অভিযান অবহত রেখে অন্ত্র উদ্ধার অভিযান চলমান রয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হলেও উত্তর বিএনপি ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে রাজনৈতিক দ্বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি দেশ বিরোধী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জড়িত। হত্যার নির্দেশদাতাদের পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি যে কারণে পুলিশের তদন্তে নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্নবিদ্ধ ও রহস্য তৈরি হয়েছে।
বিএনপিপন্থি রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একেক সময় এক ধরণের ‘কৌতুহল’ সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের তথ্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করে স্থানীয় একাধিক বিএনপি নেতাদের দাবি, আসামীদের ধরার পরেও অনেক রহস্য থেকে গেছে।
পাশাপাশি সর্বশেষ শুটার রহিমকে ধরলেও পুলিশ এখনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি, যার কারণে সত্যিকারের খুনিদের ধরা হচ্ছে কি না সেটা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। গতকাল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এদিন ভোরে নরসিংদী থেকে রহিম নামে ওই শুটারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের টিম এখনো অপারেশন পরিচালনা করছে, আমরা আসামি ধরলেও অস্ত্র উদ্ধার করতে পারিনি তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে গত ১১ জানুয়ারি ডিবির তরফে ‘শুটার’ জিন্নাতসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানালেও ‘শুটার’ রহিম পলাতক ছিলেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়। এদিকে গত ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী পাড়ায় হোটেল সুপার স্টারের পাশের গলিতে মুছাব্বিরকে গুলি করে মোটরসাইকেলে আসা আততায়ীরা।
এ সময় তার সঙ্গে থাকা আবু সুফিয়ান ব্যাপারি মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন। মুছাব্বির একসময় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব এবং কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম-সম্পাদকও ছিলেন। আর মাসুদ তেজগাঁও থানার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। এই ঘটনার পর স্থানীয়রা দুজনকে উদ্ধার করে বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মাসুদকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ৮ জানুয়ারি অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলা আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলেও মামলার রহস্যঘেরা বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এই হত্যার ঘটনায়, এরপর ১০ জানুয়ারি ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে দুই ‘শুটারের’ একজন জিন্নাত, ‘মূল সমন্বয়কারী’ মো. বিল্লাল, ঘটনার পর আসামিদের আত্মগোপনে সহায়তাকারী আব্দুল কাদির এবং ঘটনার আগেরদিন ঘটনাস্থল ‘রেকি’ করা মো. রিয়াজকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় ডিবি।
সেসময় তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল এবং নগদ ৬ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। গত ১২ জানুয়ারি জিন্নাত আদালতে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দেন। ওইদিন দুই ভাই বিল্লাল ও আব্দুল কাদিরের সঙ্গে রিয়াজকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। সেই রিমান্ড শেষে ১৯ জানুয়ারি আসামিদের আদালতে হাজির করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বিল্লালকে আবারও রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
পরে তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। আসামি মো. বিল্লালকে দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠায় আদালত। আর এদিন রাতেই নরসিংদীতে অভিযানে গিয়ে আরেক শুটার রহিমকে গ্রেপ্তার করল ডিবি।
বেরিয়ে এলো মুসাব্বিরকে হত্যার আসল রহস্য : এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে হত্যা করা হয়।
ডিএমপির ডিবিপ্রধান জানান, মূল পরিকল্পনাকারী মো. বিল্লাল, শুটার জিন্নাত ও মো. রিয়াজ এবং অনান্য আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায়। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় জড়িত ও সহায়তাকারী বিল্লালের ভাই আব্দুল কাদিরকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক ভাবে জানা যায় অপরাধীরা কারওয়ান বাজারে ব্যবসার দ্বন্দ্বে নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সঙ্গে যুক্ত হয়।
গ্রেপ্তারকৃত সকল আসামিরা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন দাবি, ডিবি প্রধাণের। পুলিশ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, মুসাব্বিরকে হত্যার দায়িত্ব বিদেশ থেকে বিল্লালকে দেন তার এক বড় ভাই। ১৫ লাখ টাকা ও মামলা সংক্রান্ত্র সব দায়িত্ব নেয়ার আশ্বাসে রাজি হন বিল্লাল। পরে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা ও একটি মোটরসাইকেলের চুক্তিতে শুটার জিন্নাতকে ভাড়া করেন তিনি। ডিএমপির ডিবিপ্রধান আরও জানান, জিন্নাতের আগে গ্রেপ্তার রিয়াজকে ভাড়া করেন বিল্লাল। কিন্তু রিয়াজ হত্যার আগের দিন মুসাব্বিকে হত্যা না করে চলে আসেন। পরে দায়িত্ব পান জিন্নাত।
নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক সেচ্ছাসেবক দলের এক সাবেক নেতা জানান, মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ আমাদের দলের অনেককে হয়রানী করেছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কিন্তু দুখের বিষয় হলো গতকাল আরেক শুটার ধরা পড়লেও অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে রহস্য তৈনি হয়েছে। তা ছাড়া জুলাই বিপ্লবের পর বিএনপির যত লোকজন হত্যার শিকার হয়েছে পুলিশ একটি ঘটনায়ও সত্যিকারের অপরাধীদের ধরেতে পারেনি বরং আমাদের বিএনপির নেতাদের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই ঘটনায় পুলিশ একেক সময় একেক ধরণের তথ্য দিয়েছে যেমনটা মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডে অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এবং হত্যার আসল রহস্য কি রাজনৈতিক দ্বন্ধ, না কি ব্যবসায়িক? অনেক কিছুর উত্তর জানা নেই বলে দাবি করেন সেচ্ছাসেবক দলের এই নেতা। তার দাবি এই ঘটনার আসল অপরাধীদের ধরতে হবে অন্যথায় মানুষের মনে প্রশ্নে থেকে যাবে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতে রাজধানীর তেজগাঁও থানার পশ্চিম তেজতুরি বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন মুসাব্বির। এ ঘটনায় পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। সেই অজ্ঞত মামলায় সন্দেহভাজন ও হত্যায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।