বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন

২ হাজার রুপি ধার করে ছেলেকে খুঁজছেন হেঁটে হেঁটে

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

তালকা সাডার চোখ ক্লান্ত, দুশ্চিন্তায় তার মুখের বলিরেখায় ভাঁজ পড়ে গেছে। নেপালের পাহাড়ি পথে দীর্ঘসময় হাঁটার পর তার গোড়ালিতে ব্যথা করছে। তিনি ক্ষুধার্ত ও ক্রুদ্ধ, কিন্তু আশা আর অসহায়ত্বের মধ্যে তার মন দোদুল্যমান থাকলেও, তার লক্ষ্যের উপরই তার মনোযোগ স্থির: ছেলের জন্য মরিয়া অনুসন্ধান।

পঞ্চাশোর্ধ সাডা নেপালের তরাই অঞ্চলের সপ্তরী জেলার বাসিন্দা। তরাই অঞ্চল হলো দক্ষিণ নেপালজুড়ে বিস্তৃত এক সমভূমি, যা শিবালিক পর্বতমালার দক্ষিণে এবং ভারতের সাথে অরক্ষিত সীমান্তের উত্তরে অবস্থিত।

হিমালয় অঞ্চলের এই অঞ্চলের মানুষ মধেসি নামে পরিচিত, যারা একটি স্বতন্ত্র জাতিভাষাগত জনগোষ্ঠী এবং যাদের রয়েছে বৈচিত্র্যময় আঞ্চলিক, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পরিচয়। সাডার তিন মেয়েও আছে। ২৬ আগস্টের বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় উত্তর নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বাড়িঘর, স্কুল, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পথের সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার একমাত্র ছেলে বিনোদ নিখোঁজ।

ভোতে কোশি নদী থেকে সৃষ্ট বন্যার ঠিক একদিন আগে সাদা ১৯ বছর বয়সী বিনোদের সাথে শেষবার কথা বলেছিলেন। বিনোদ এক মাস আগে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল রাসুয়া জেলায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে এসেছিলেন। তিনি সিমেন্ট মেশানোর কাজ এবং অন্যান্য ছোটখাটো কাজও করতেন। তার সাথে কাজ করা আরো চারজন যুবক—যাদের সবার বয়স ১৭ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে—বন্যার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছে।

 

চোখের পানি মুছতে মুছতে সাডা বলেন, “আমার স্ত্রী যে কী পরিমাণ কাঁদছে তা আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। আমি নিজেও গভীর যন্ত্রণার মধ্যে আছি এবং আমি জানি না কী করব।”

সাডা তার পকেটে একটি ময়লা রুমাল দেখান, যার মধ্যে প্রায় দুই হাজার নেপালি রুপির (প্রায় ১৩ ডলার) কুঁচকানো নোট রয়েছে। এই টাকা তিনি ধার করেছিলেন তার ছেলেকে খুঁজতে নেপালের বন্যা-বিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য।

তিনি বলেন, “সপ্তরী থেকে এতদূর আসার জন্য আমি টাকা ধার করেছি। ধার করা প্রতি ১০০ রুপির উপর আমাকে ২০ রুপি সুদ দিতে হবে।”

কাঠমান্ডুতে, সাডা এবং তার ভাই বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে বা মৃত ঘোষিতদের তালিকায় বিনোদকে খুঁজতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে যাচ্ছেন — বন্যা দুর্গতদের অনেককেই নেপালের উত্তরাঞ্চল থেকে বিমানে করে কাঠমান্ডুতে আনা হয়েছিল।

 

মর্গের বাইরে প্রদর্শিত ছবিগুলো প্রায়শই চেনা কঠিন। উদ্ধার করা বেশিরভাগ মৃতদেহ পচে গেছে বা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে। বিনোদের কোনো চিহ্ন ছিল না — হাসপাতালগুলোতে তার নাম বা ছবিও ছিল না।

তাই, সাডা নুয়াকোটের (কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটা দূরে) দিকে হাঁটতে শুরু করেন, যা ছিল সেই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছাকাছি, যেখানে তার ছেলে কাজ করত বলে মনে করা হতো।

ভাঙা রাস্তার মধ্যে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কষ্টকর হাঁটার পর, তারা পথের ধারে অবস্থিত ত্রিশুলি শহরে পৌঁছালেন, যার বাজার এখন ধ্বংসাবশেষ, কাদা আর কর্দমাক্ত বরফে ঢাকা।

সাডা বলেন, “গত রাতে যখন আমরা এখানে পৌঁছাই, তখন একটি লজ আমাদের কাছ থেকে রাত কাটানোর জন্য ১ হাজার ৫০০ নেপালি রুপি চেয়েছিল। তারা আমাদের শুধু এক ছোট বাটি ভাত দিয়েছিল, যা আমাদের খিদেও মেটাতে পারেনি। এখন যদি আমাদের এখানে আরো এক রাত থাকতে হয়, তাহলে আমার বাকি সব টাকা শেষ হয়ে যাবে এবং বাড়ি ফেরার জন্য আমার কাছে কিছুই থাকবে না।”

সাডা ও তার ভাই জানান, তারা শুধু দুর্যোগ কবলিত এলাকা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষদের উদ্ধার এবং মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য স্থাপিত মর্গ ও সেনা শিবিরে প্রবেশের সুযোগ চেয়েছিলেন, কিন্তু তাদেরকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভাইদের মতে, সাহায্যের জন্য তাদের আবেদনের জবাবে যে প্রতিক্রিয়া তারা পেয়েছেন, তা নেপালের গভীরে প্রোথিত জাতিগত ও বর্ণগত বিভাজনেরই ফল। মধেসিরা—তরাই অঞ্চলের মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি অঞ্চলের নেপালি অভিজাতদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছে তারা।

সাডার পরিবার মুসাহর সম্প্রদায়ের, যা তরাই অঞ্চল এবং ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহার রাজ্যে বসবাসকারী একটি বিশেষভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

কান্নাভেজা কণ্ঠে সাডা বলেন, “আমরা গরীব। ওরা আমাদের মধেসি আর বিহারী বলে মনে করে। আমরা অনর্গল নেপালি বলতে পারি না—এ কারণেই ওরা আমাদের শুধু দূরে ঠেলে দিচ্ছে আর দ্বারে দ্বারে ঘোরাচ্ছে।  এমনকি যদি সেটা মৃতদেহও হয়, সেটা দেখার অধিকার আমাদের আছে। আমরা থানা থেকে শুরু করে সেনা ছাউনি পর্যন্ত সব জায়গায় নাম লিখিয়েছি। কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করছে না।”

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102