ভারত যে দামে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, তার চেয়ে ১২৭ শতাংশ বেশি দামে চীনের কাছ থেকে ‘বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ’ কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু ঢাকা কেন এমন চড়া দামে চীনের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, সোমবার (২ আগস্ট) তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়া টুডে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারত সম্প্রতি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ চার্জ হিসেবে প্রতি ইউনিটে ০.০১ রুপি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলে তাতে আপত্তি জানায় ঢাকা। দিল্লি পরে তা কমিয়ে ০.০০৫ রুপির করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এর কয়েকদিন পরেই জানা যায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি চীনা কোম্পানিকে প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইন্ডিয়া টুডের মতে, চীনের প্রকল্পটি আকারে বেশ ছোট- যার প্রস্তাবিত ক্ষমতা মাত্র ৪২ মেগাওয়াট। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ঢাকার ক্রমবর্ধমান বর্জ্য সমস্যার সমাধান করা। তবে এই বৈপরীত্যটি এমন এক রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মুহূর্তে সামনে এল যখন বাংলাদেশ তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতি, গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের সঙ্গে লড়াই করছে; পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিবাদে রাস্তায় বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে।
চীনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রস্তাবিত প্রতি ইউনিটের দর ২৫ টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কেনা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দামের (প্রায় ১১ টাকা) চেয়ে ১২৭ শতাংশ বেশি।
ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এই তুলনার ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপটটি বোঝা জরুরি। ঢাকার আমিনবাজারে অবস্থিত এই প্রকল্পটি ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশে আসা বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো বিকল্প বা প্রতিস্থাপন নয়। বরং আমিন বাজারের এই প্রকল্পের ঢাকা তার ক্রমবর্ধমান শহুরে বর্জ্যের পাহাড়, যা মূলত একটি পরিবেশগত সমস্যা; একে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য দরকারি পণ্যে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে।
ভারতের ০.০১ রুপি চার্জ বনাম চীনের ২৫ টাকার বিদ্যুৎ
এই পার্থক্যটি তখনই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন বাংলাদেশ সীমান্তপারের বিদ্যুৎ লেনদেনে ভারতের প্রস্তাবিত ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ (এসএনএ) চার্জের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়।
গত ২৪ আগস্ট সীমান্তপারের বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ওপর ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল ইলেক্ট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশনের সিদ্ধান্তের পর ভারত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি এসএনএ চার্জ আরোপের প্রস্তাব দেয়।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) আপত্তি তোলার আগে প্রাথমিক প্রস্তাবে এটি ছিল প্রতি ইউনিটে ০.০১ রুপি।
এই এসএনএ চার্জ কোনো বিদ্যুতের সরাসরি দাম নয়। এটি সীমান্তপারের বিদ্যুতের আদান-প্রদান, শিডিউলিং, মিটারিং, এনার্জি একাউন্টিং ও গ্রিড পরিচালনার খরচ বহনের জন্য ধার্য করা হয়। ভারতীয় কর্মকর্তারা মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয়টি বেশ সামান্য।
আর এ কারণেই আমিনবাজারের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ঢাকার ২৫ টাকা দিতে রাজি হওয়ার বিষয়টি আলোচনার সৃষ্টি করেছে
অবশ্য এই দুই চার্জকে সরাসরি তুলনা করা যায় না। ভারতের এসএনএ ফি হলো একটি অতিরিক্ত লেনদেন ও গ্রিড-সংক্রান্ত সেবা খরচ; অন্যদিকে ২৫ টাকা হলো বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রস্তাবিত প্রতি ইউনিটের পুরো দর।
বাংলাদেশ কেন এত দামি বিদ্যুতের ওপর বাজি ধরছে?
‘ডেইলি স্টার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে আমদানিকৃত বিদ্যুতের গড় দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রতি ইউনিট ৫.৮২ টাকা থেকে ১১.৭২ টাকা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, আমিনবাজার প্রকল্পের প্রস্তাবিত ২৫ টাকা প্রতি ইউনিটের দর ২০২৫ অর্থবছরের আমদানিকৃত বিদ্যুতের গড় দামের দ্বিগুণেরও বেশি।
তবে ক্ষমতার দিক থেকে আমিনবাজার প্রকল্পটি ভারতের বিদ্যুৎ আমদানির সমকক্ষ নয়।
ডেইলি স্টারের তথ্যমতে, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কেনায় যে মোট ১২১,৪২০ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল, তার মধ্যে ভারত থেকে কেনা বিদ্যুতের অংশ ছিল ১৫.৮ শতাংশ (প্রায় ১৯ হাজার ২২৫ কোটি টাকা)।
অন্যদিকে, চীনা এই প্রকল্প থেকে উৎপাদন হবে মাত্র ৪২ মেগাওয়াট। এর প্রাথমিক লক্ষ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আর বিদ্যুৎ পাওয়াটা একটি অতিরিক্ত সুবিধা।
চীনা বিদ্যুৎ কেন ২৫ টাকায় কিনছে বাংলাদেশ?
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
‘নিউ এজ’-এ প্রকাশিত ২৭ আগস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার চীনা একটি কোম্পানির কাছ থেকে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ২৫ টাকায় কিনবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, এই প্রকল্পের ক্ষমতা হবে ৪২ মেগাওয়াট এবং আগামী ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরু হতে পারে।
মন্ত্রীর মতে, ২০২৮ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমিনবাজারের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে।
তিনি আরও জানান, এই প্রকল্পে সরকারকে সরাসরি কোনো বিনিয়োগ করতে হবে না।
তাই প্রকল্পটিকে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। চীনা বিনিয়োগকারী ল্যান্ডফিলের বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং উপজাত হিসেবে জৈব সার তৈরি করবে। পাশাপাশি ল্যান্ডফিল ব্যবহারের জন্য তারা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনকে মাসিক ভাড়াও দেবে।
প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, বিদ্যুতের দাম বেশি মনে হতে পারে, তবে তিনি দাবি করে, প্রকল্পটি বিশাল পরিবেশগত সুবিধা এনে দেবে।
প্রকৃতপক্ষে, ঢাকা কেবল বিদ্যুৎ কিনছে না; এটি একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উদ্যোগ।
বাংলাদেশ বিদ্যুতের জন্য এখনও ভারতের ওপর বেশি নির্ভরশীল
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের ভূমিকা দেখা গেলেও ভারতই বাংলাদেশের আমদানিকৃত বিদ্যুতের প্রধান উৎস। বিভিন্ন চুক্তির আওতায় ভারত থেকে বর্তমানে ২,৬৫৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে- যেখানে চীনের এই আমিনবাজার প্রকল্প যোগ করবে মাত্র ৪২ মেগাওয়াট, সেখানে ভারতের সঙ্গে চুক্তির পরিমাণ ২,৬৫৬ মেগাওয়াট।
তাই চীনের এই প্রকল্পকে কোনোভাবেই ভারতের সরবরাহকৃত বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মূল গুরুত্ব ঢাকার বর্জ্য নিরসনে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনে ভূমিকা আরও বাড়তে পারে
আমিনবাজার প্রকল্পটি বাংলাদেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরিতে চীনা শক্তির সূচনা হতে পারে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ল্যান্ডফিলের বর্জ্য থেকেও বিদ্যুৎ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ প্রকল্পের জন্য চীনা কোম্পানি ‘পাওয়ারচায়না’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বর্জ্যকে শক্তিতে রূপান্তর করার খাতে চীনা কোম্পানিগুলোর প্রভাব আরও বাড়বে।
তবে সাময়িকভাবে আমিনবাজার প্রকল্পটি বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতায় খুব ছোট একটি সংযোজন মাত্র।
বাংলাদেশ যখন রাজপথে ছড়িয়ে পড়া বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন একদিকে ভারত থেকে আসা বিদ্যুতের ০.০১ রুপি ফি নিয়েও আপত্তি জানাচ্ছে, আবার অন্যদিকে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য চীনা কোম্পানিকে ২৫ টাকা দিতে যাচ্ছে।
ভারতের প্রতি ইউনিট ০.০১ রুপির ফি এবং চীনের ২৫ টাকার বিদ্যুৎ দর সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়- কারণ ভারতীয় ফি ছিল কেবল গ্রিড পরিচালনার খরচ আর চীনের দর পুরো বিদ্যুৎ ও বর্জ্য সারণের খরচ। তা সত্ত্বেও বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে এমন উচ্চমূল্যের চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই জনমনে ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষ নজর কাড়ছে।