রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮ অপরাহ্ন

সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা ফেরত শুরু মালয়েশিয়ার, বাংলাদেশের কবে?

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি। একের পর এক উদ্যোগ, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও প্রত্যাবাসনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা হলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে পারেনি বাংলাদেশ। এরই মধ্যে মালয়েশিয়া আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় ৫০০ রোহিঙ্গাকে স্বেচ্ছামূলকভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ফলে নতুন করে সামনে এসেছে প্রশ্ন— মালয়েশিয়া যখন প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে, বাংলাদেশ কবে শুরু করবে রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন?

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর ব্যাপক সহিংসতার পর প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। টেকনাফ ও উখিয়ার পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ, দড়ি ও ত্রিপল দিয়ে গড়ে ওঠে বিশাল শরণার্থীশিবির। সময়ের সঙ্গে উখিয়া-টেকনাফ পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থীঘন এলাকায়।

এরপর ২০২৪ সাল থেকে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পাশাপাশি প্রতিবছর ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। সব মিলিয়ে কক্সবাজার ও ভাসানচরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর।

এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় দিয়ে আসার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই আলোচনা কোনো কার্যকর প্রত্যাবাসনে গড়ায়নি।

অন্যদিকে প্রায় এক দশক আগে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া মালয়েশিয়ার অবস্থানও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। ওই সময় মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে অনেক রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশে আশ্রিত কিছু রোহিঙ্গাও পরে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়।

কিন্তু বর্তমানে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈরিতা বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এক লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থীদের স্বীকৃতি না দেওয়ায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আবাসনের ক্ষেত্রে তাদের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য পরিচালিত অনানুষ্ঠানিক একটি স্কুলে পুলিশ অভিযান চালানোর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই মালয়েশিয়া স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় ৫০০ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। প্রত্যাবাসনের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটে এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির।

তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি মালয়েশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কারণ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। তাদের অধিকাংশই ২০১৭ সালের সহিংসতার প্রত্যক্ষ শিকার। আবার ২০২৪ সালের পর নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশেরও মিয়ানমারে ফেরার মতো নিরাপদ পরিবেশ নেই।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার ২০১৭ সালের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল। ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমারে ফিরে গেলে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত হবে কি না— এ নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা তৈরি না হওয়ায় সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

এরপর ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করলে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশটিতে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতিও অনুকূল নয়। বরং ২০২৪ সালের পর নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ঘটনা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জটিলতা আরও বাড়িয়েছে।

এর মধ্যে মিয়ানমার আবারও রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে পুরোনো অবস্থান সামনে এনেছে। দেশটির বক্তব্য, মিয়ানমারে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই; তারা রাখাইনের ‘বাঙালি’ অধিবাসী।

গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে তাদের কাছে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪টি নাম পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে বাংলাদেশে থাকা রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করেছে মিয়ানমার। রাখাইনের পরিস্থিতি ‘অনুকূল’ হলে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দেশটি।

তবে ঢাকার সঙ্গে মিয়ানমারের এই হিসাবের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। মিয়ানমারের ওই বিবৃতির পরদিন দেশটির রাষ্ট্রদূত উ থান সোয়েকে ডেকে পাঠিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, নেপিদোর দেওয়া তথ্য ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বাংলাদেশ বলেছে, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত নিবন্ধনেই প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের হিসাবে কক্সবাজার ও ভাসানচরে নিবন্ধিত ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন রোহিঙ্গার মধ্যে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৭ জনের বয়স ১৮ বছরের বেশি। আর নবজাতক থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৬ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৭। অর্থাৎ মোট রোহিঙ্গা জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি শিশু। ১১ বছরের নিচে বয়সী শিশুর সংখ্যাই ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি।

এই বিপুলসংখ্যক শিশুর বড় একটি অংশ মিয়ানমারের কোনো স্মৃতি ছাড়াই বাংলাদেশে বেড়ে উঠছে। ফলে সময় যত বাড়ছে, প্রত্যাবাসন ততই কঠিন ও জটিল হয়ে উঠছে।

দীর্ঘদিনের শরণার্থী জীবনে মানবিক পরিস্থিতিও অবনতির দিকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। নিরাপত্তা ঝুঁকি, অপহরণ, মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনাও সরকারের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অনেকে দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর হয়ে এই পথে যাত্রা অত্যন্ত প্রাণঘাতী; ২০২৫ সালে প্রতি সাতজনের একজন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকারের জন্য প্রত্যাবাসন এখন শুধু মানবিক ইস্যু নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।

তবে প্রশ্ন হলো—কবে শুরু হবে সেই প্রত্যাবাসন?

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। বরং সরকারের অবস্থান হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না করে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে না।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সম্প্রতি বলেছেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের কাঁধে তুলে নিয়ে এখন বাংলাদেশ নিজেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রাখাইনে তৈরি হওয়া সমস্যার সমাধান তাদের সেখানে প্রত্যাবাসনের মধ্যেই রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন, ‘দশ বছরকে কোনোভাবে বিশ বছর হতে দেওয়া উচিত নয়।’

চীনের ভূমিকাও নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে চীন। একই সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে করিডোর তৈরির প্রস্তাবও এসেছে।

উল্লেখ, মালয়েশিয়া ২৯ সেপ্টেম্বর ৫০০ রোহিঙ্গাকে স্বেচ্ছামূলকভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশের জন্য অবশ্য একই মডেল সরাসরি অনুসরণ করা কঠিন। কারণ এখানে রোহিঙ্গার সংখ্যা মালয়েশিয়ার তুলনায় প্রায় দশ গুণ এবং তাদের ফিরে যাওয়ার গন্তব্য রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102