মহাসচিব তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়—এটি বর্তমানে বাস্তবতা। গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্বজুড়ে জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রমের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি ও অপরিবর্তনীয়।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার আহ্বান
বক্তৃতায় জাতিসংঘ মহাসচিব জীবাশ্ম জ্বালানিকে বর্তমান সংকটের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বৈশ্বিক রূপান্তরের আহ্বান জানান। তার মতে, সৌর ও বায়ু শক্তির খরচ কমে আসায় এটি এখন সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য জ্বালানি উৎসে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনের একমাত্র টেকসই পথ হলো নবায়নযোগ্য শক্তি।
বৈশ্বিক নির্গমন হ্রাসে জরুরি পদক্ষেপ
মহাসচিব জানান, বর্তমান জাতীয় প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে নির্গমন মাত্র ১০ শতাংশ কমবে, কিন্তু ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজন ৬০ শতাংশ হ্রাস। তিনি উন্নত ও বড় অর্থনীতিগুলোর প্রতি দ্রুত নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত কমানো এবং মিথেন নির্গমন হ্রাসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
ন্যায্য রূপান্তরের প্রয়োজন
বক্তৃতায় তিনি জোর দিয়ে বলেন, জলবায়ু রূপান্তর অবশ্যই ন্যায্য হতে হবে। শ্রমজীবী মানুষ, ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও কম আয়ের জনগোষ্ঠীকে এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
তিনি সতর্ক করেন, যদি ন্যায্যতা নিশ্চিত না করা হয়, তবে জলবায়ু পদক্ষেপ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশ ও অর্থায়ন
মহাসচিব উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ঝুঁকির তুলনায় সহায়তা বণ্টনে পিছিয়ে আছে।
তিনি ধনী দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত অর্থ দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিবছর ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি, এআই ও স্বচ্ছতা
তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি জলবায়ু সমাধানে সহায়ক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও সম্পদ ব্যবহার করছে।
এ কারণে তিনি ‘AI Environmental Transparency Initiative’ চালুর প্রস্তাব দেন, যাতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পরিবেশগত প্রভাব প্রকাশ করে।
জলবায়ু ঝুঁকি ও অভিযোজন
মহাসচিব বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যে বাস্তব—খরা, বন্যা, ঝড় ও খাদ্য সংকট ক্রমাগত বাড়ছে। তাই অভিযোজন (adaptation) এখন বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য।
তিনি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বিজ্ঞান ও তথ্যের গুরুত্ব
বক্তৃতার শেষাংশে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিজ্ঞান ও সত্যের প্রতি আস্থা অপরিহার্য। বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার রোধ করতে হবে এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
মহাসচিব তার বক্তব্য শেষ করেন এই আহ্বান জানিয়ে যে, বর্তমান সময়ই জলবায়ু পদক্ষেপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তিনি বলেন, এটাই আমাদের সিদ্ধান্তের সময়, আমাদের সুযোগের সময়। এখনই আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির যুগ শেষ করে নবায়নযোগ্য শক্তির ভবিষ্যৎ গড়তে হবে।







