শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ০২:৫৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

ভিভাটেক ২০২৬, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন প্রতিযোগিতা

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি কোনো সাধারণ প্রযুক্তি প্রদর্শনী নয়; এটি ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ সম্মেলন ভিভাটেক ২০২৬, যা ১৭ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত প্যারিসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনটি উদযাপন করছে তার দশম বর্ষপূর্তি।

আয়োজকদের তথ্যমতে, বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রতিনিধি, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিয়েছে। চার দিনের এ আয়োজনে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার দর্শনার্থী অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি ২ হাজার ৫০০-এর বেশি স্টার্টআপ তাদের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও সেবা তুলে ধরছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা ভিভাটেক এক দশকে স্টার্টআপ ও বিনিয়োগকারীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কূটনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

প্রদর্শনী হলজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। কোথাও কয়েক সেকেন্ডেই দর্শনার্থীর ছবি থেকে নতুন প্রতিকৃতি তৈরি করছে এআই, কোথাও চিকিৎসকদের রোগ শনাক্তকরণে সহায়তাকারী প্রযুক্তি প্রদর্শিত হচ্ছে।

বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে বোস্টন ডায়নামিক্সের নতুন হিউম্যানয়েড রোবট অ্যাটলাস, যা মানুষের মতো অঙ্গভঙ্গিতে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। একই সঙ্গে ফরাসি স্টার্টআপ মিস্ট্রাল এআই তাদের নতুন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল প্রদর্শন করছে, যা কম শক্তি ব্যবহার করে ডিভাইসেই পরিচালিত হতে সক্ষম।

কয়েক বছর আগেও প্রযুক্তি সম্মেলনের আলোচনায় নতুন অ্যাপ বা নতুন ডিভাইস গুরুত্ব পেত। এবার সেই জায়গা দখল করেছে এআই, যা এখন অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্র পরিচালনার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এবারের সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে ইউরোপের অবস্থান।

সে কারণেই প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারাও। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এআই, সেমিকন্ডাক্টর, ক্লাউড অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার ও ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এখন শুধু ব্যবসার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কৌশল ও ভূরাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

সম্মেলনের মূল মঞ্চে বক্তব্য দেন বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও শিল্পনেতারা। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস বলেন,

“আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এআই আমাদের কর্মদক্ষতাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যা গত ৫০ বছরেও দেখা যায়নি। তবে প্রযুক্তির বিকাশ যেন পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত কার্বন চাপ সৃষ্টি না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।”

বক্তাদের কেউ এআইকে শিল্পবিপ্লবের পর মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আবার কেউ প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন।

ভিভাটেকের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশ স্টার্টআপ জোন। ছোট ছোট বুথে তরুণ উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্ভাবন তুলে ধরছেন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের সামনে।

স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, কৃষি প্রযুক্তি, সফটওয়্যার, এআইভিত্তিক সমাধান—বিভিন্ন খাতের স্টার্টআপগুলোর মধ্যে নতুন অংশীদার ও বিনিয়োগ পাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে।

কানাডা থেকে আসা উদ্যোক্তা মারিয়ানা বলেন, “ভিভাটেকে চার দিনে যত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, সাধারণভাবে তা করতে কয়েক মাস লেগে যেত। একই দিনে বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সম্ভাব্য গ্রাহকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগই এখানে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

সম্মেলনের বিভিন্ন হলে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চলেছে ধারাবাহিক বৈঠক। কোথাও পাঁচ মিনিটের পিচ, কোথাও দীর্ঘ আলোচনা—যার মধ্য থেকেই কখনো কোটি কোটি ইউরোর বিনিয়োগের পথ তৈরি হতে পারে।

শুধু ব্যবসা নয়, ভিভাটেক প্রযুক্তির এক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। রোবটের সঙ্গে ছবি তুলছে শিশুরা, তরুণেরা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নতুন জগতে, এআই-নির্ভর গেমিং প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো।

আয়োজকদের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি প্রদর্শনী আয়োজন নয়; বরং প্যারিসকে সিলিকন ভ্যালি, শেনজেন, বেঙ্গালুরু ও সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

বিশ্ব প্রযুক্তি খাত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এআই, অটোমেশন ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি।

ভিভাটেক ২০২৬ ঘুরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন বিপুল আশাবাদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে উদ্বেগও। এআই কি মানুষের কাজ কেড়ে নেবে, নাকি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে? প্রযুক্তি কি বৈষম্য কমাবে, নাকি বাড়াবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে যে প্রতিযোগিতা, যে বিতর্ক এবং যে স্বপ্ন, তার বড় একটি অংশ এখন প্যারিসের ভিভাটেককে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102