শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
সুন্দরবনের কুখ্যাত বনদস্যু “ছোট সুমন” বাহিনীর প্রধান’সহ সাতজনেট আত্মসমর্পণ রামপালে ভূমিসেবা মেলা ২০২৬-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত পাসপোর্টে ফিরছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’, বাদ পড়ছে শেখ মুজিবের সমাধিসৌধের জলছাপ ২৩ মে’র সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল রামিসা হত্যাকাণ্ড : এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ আইনমন্ত্রীর ৯৫ কোটির সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া নজরদারির জন্য মেয়েশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হতে হবে যেভাবে র‌্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে ‘ঈদ ব্লিস ফিয়েস্তা’ আয়োজন ঢাকাসহ পাঁচ বিভাগে ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা ৭৯তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশ, নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী মুহিত

মেয়েশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হতে হবে যেভাবে

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

গ্রামের এক যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন সুরভী (ছদ্মনাম)। তখন তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া সবই ছিল স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশের অংশ। এক দুপুরে এক আত্মীয় তাকে পাশের ঘরে ডেকে নেয়। ঘরে ঢোকার পর হঠাৎই বদলে যায় পরিস্থিতি। ছোট্ট সুরভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।

এখন ২৮ বছর বয়সি সুরভী বলেন, সেই ঘটনার সময় তিনি কিছুই বুঝতে পারেননি। শুধু ভয়, আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব তাকে ঘিরে ধরেছিল। বড় হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, সেটি ছিল যৌন নির্যাতন। কিন্তু ভয় আর সামাজিক লজ্জার কারণে তিনি বিষয়টি কাউকে বলতে পারেননি।

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, সুরভীর অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার বড় অংশই ঘটে পরিচিত মানুষের মাধ্যমে যাদের মধ্যে আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও থাকেন।

সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ঘিরে আবারও সামনে এসেছে শিশু নিরাপত্তার প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন শিশুটির প্রতিবেশী। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই মন্তব্য করছেন, শুধু অপরিচিত নয়, পরিচিতদের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি।

গবেষণা ও বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, শিশু নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ। বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতনকারী আত্মীয়, বন্ধু বা পরিবারের বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি হয়ে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীনের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মাত্র এক-চতুর্থাংশ ঘটনায় অপরাধী ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। বাকি ঘটনাগুলোতে অভিযুক্ত ছিলেন আত্মীয় বা পরিচিত মানুষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা সহজে প্রতিবাদ করতে পারে না বলেই তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। পরিচিত মানুষের প্রতি শিশুর স্বাভাবিক বিশ্বাসকেই অনেক সময় অপব্যবহার করা হয়।

শিশুর আচরণে যেসব পরিবর্তন সতর্ক সংকেত হতে পারে

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, যৌন সহিংসতার শিকার শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। শিশুটি অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে যেতে পারে, খিটখিটে আচরণ করতে পারে কিংবা আগের মতো স্বাভাবিকভাবে মিশতে না চাইতে পারে।

এ ছাড়া কিছু শিশুর মধ্যে দেখা দিতে পারে

হঠাৎ ভয় বা উদ্বেগ বৃদ্ধি, একা থাকতে না চাওয়া, স্কুলে যেতে অনীহা, পড়াশোনায় অমনোযোগ, দুঃস্বপ্ন দেখা বা ঘুমের সমস্যা, পুরুষদের এড়িয়ে চলা, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, অকারণে কান্না বা রাগ।

কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক উপসর্গও দেখা দিতে পারে। যেমন মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট, ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠা কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অভিজ্ঞতা শিশুর মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় তারা নিজের মধ্যে অপরাধবোধ তৈরি করে ফেলে এবং সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়।

অভিভাবকদের কী করা উচিত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে যাতে সে ভয় ছাড়াই নিজের কথা বলতে পারে।

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে শেখানো জরুরি। তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে শরীরের কোন অংশ ব্যক্তিগত এবং সেখানে অন্য কারো স্পর্শ গ্রহণযোগ্য নয়।

অভিভাবকদের প্রতি বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ

শিশু কোথায় যাচ্ছে ও কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, তা খেয়াল রাখা, পরিচিত মানুষ হলেও অন্ধভাবে বিশ্বাস না করা, শিশুকে জোর না করে ধৈর্য নিয়ে কথা শোনা, শিশু অস্বস্তি বোধ করলে তাকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রয়োজনে কাউন্সেলর বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া।
কর্মজীবী বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে শিশুর পরিবেশ পর্যবেক্ষণে বাড়তি সতর্কতা রাখা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকে এমনভাবে বড় করতে হবে যাতে সে ‘না’ বলতে শেখে এবং কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি হলে দ্রুত বাবা-মা বা বিশ্বস্ত বড়দের জানাতে পারে।

আইন আছে, বাস্তবায়নে প্রশ্ন

বাংলাদেশে শিশু ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ কার্যকর রয়েছে। এ আইনে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার মতো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।

তবে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। অনেক মামলার তদন্ত ও চার্জশিট দিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, ফলে ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে।

অধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং পারিবারিক চাপের কারণেও বহু ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। অনেক পরিবার ভবিষ্যৎ সামাজিক অবস্থান বা সন্তানের বিয়ে নিয়ে উদ্বেগে অভিযোগ গোপন রাখার চেষ্টা করে।

তাদের মতে, শিশু সুরক্ষায় শুধু পরিবার নয় স্কুল, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একইসঙ্গে দ্রুত বিচার, শিশুবান্ধব থানার পরিবেশ এবং সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ কঠিন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102