মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা মুহূর্তে মুহূর্তে রূপ পাল্টাচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে কেন তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহ দিয়েছিল এমন অভিযোগ উঠছে। কেন সৌদির যুবরাজ বারবার ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অনুরোধ করছেন তা নিয়েও দেখা দিয়েছে রহস্য।
সম্প্রতি সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ) স্বাক্ষর করলে ইরানের কৌশলগত মহলে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি ইসরায়েলবিরোধী একটি বৃহত্তর জোটের সূচনা হতে পারে। এমনকি ইরানের পক্ষ থেকেও এই ধরনের জোটে যোগদানের আগ্রহ দেখা যায়।
তবে সেই আশা ভেঙে যায়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যথাক্রমে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘রোরিং লায়ন’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন, যদিও প্রকাশ্যে সৌদি আরব কূটনৈতিক সমাধানের কথাই বলে এসেছে।
১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর থেকেই উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর কাছে ইরান একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। ইরানের ‘বিপ্লব রপ্তানি’ নীতি এবং শিয়া প্রভাব বিস্তারের কৌশল সৌদি নেতৃত্বের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চ্যালেঞ্জ।
ইরান ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননজুড়ে তার প্রভাব বিস্তার করে তথাকথিত ‘শিয়া অর্ধচন্দ্র’ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়াও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচিত।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছে। বিপরীতে সৌদি আরব ও আমিরাত আধুনিক অস্ত্র কিনলেও ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি।
এদিকে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ এবং আমিরাতের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ পরিকল্পনা চলমান। কিন্তু আঞ্চলিক অস্থিরতা এই পরিকল্পনাগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, তেল স্থাপনা এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো বারবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটায় তেল ও গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল থাকা সত্ত্বেও উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের ঝুঁকির মুখে দেখছে। কারণ, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিশ্চিত নয়।
সমালোচকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের চেয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে করে উপসাগরীয় দেশগুলো ভবিষ্যতে আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততার খবর নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।