সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। পবিত্র ও আধ্যাত্মিক এই স্থানে স্লোগান দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা–সমালোচনা।
বুধবার (৪ মার্চ) রাতে তারাবির নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে দরগাহে যান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা, যার মধ্যে ছিলেন সারজিস আলম, নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী এবং নাহিদ ইসলাম। তাদের আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিপুল সংখ্যক তরুণ সমর্থক দরগাহ প্রাঙ্গণে জড়ো হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জিয়ারত ও নামাজ শেষে দরগাহ থেকে নামার সময় হঠাৎ চারপাশ থেকে শতাধিক তরুণ তাদের ঘিরে ফেলেন। এ সময় উপস্থিত জনতার একাংশ আবেগঘন পরিবেশে স্লোগান দিতে শুরু করেন। শোনা যায়—‘জাস্টিস ফর হাদি’, ‘দিল্লি না সিলেট’সহ বিভিন্ন স্লোগান।
এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন স্থানে এ ধরনের স্লোগান দেওয়া কতটা শোভন।
সমালোচকদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, ‘মাজার রাজনৈতিক মঞ্চ নয়; এটি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক আবেগের জায়গা। সেখানে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া অনভিপ্রেত।’ আবার কেউ কেউ বলেন, ‘তরুণদের আবেগ থাকতেই পারে, কিন্তু স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।’
অন্যদিকে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট এক নেতা বলেন, দরগাহে স্লোগান দেওয়ার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। তিনি দাবি করেন, ‘নামাজ ও জিয়ারত শেষে বের হওয়ার সময় উপস্থিত তরুণদের আবেগ থেকেই হঠাৎ স্লোগান শুরু হয়। মাজারে গিয়ে স্লোগান দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।’
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক স্থানের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা অনেক বেশি। তাই রাজনৈতিক কর্মসূচি বা স্লোগানের ক্ষেত্রে এসব স্থানকে এড়িয়ে চলাই সমীচীন। তাদের মতে, তরুণ নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা বাড়লেও জনসমাগমের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং প্রতীকী স্থানগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো রাজনৈতিক পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি যদি স্বতঃস্ফূর্তও হয়ে থাকে, তবু ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রাজনৈতিক কর্মীদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে এনসিপির সিলেট মহানগরের আহ্বায়ক এডভোকেট মো. আব্দুর রহমান আফজাল মাজারে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দরগাহে নামাজ ও জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন তারা, সেখানে স্লোগান দেওয়ার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, উপস্থিত বিপুল সংখ্যক তরুণ সমর্থক আবেগের বশে স্লোগান দিতে শুরু করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে তারা স্বীকার করেন, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক স্থানগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
এডভোকেট মো. আব্দুর রহমান আফজাল বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, ধর্মীয় স্থান মানুষের আধ্যাত্মিক অনুভূতির জায়গা। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’
উল্লেখ্য, সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত এখানে জিয়ারত করতে আসেন।