রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রামে শিশু ইরা হত্যার মূলহোতা গ্রেপ্তার

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

সাত বছরের ছোট্ট জান্নাতুল নাঈমা ইরা। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। কাঁধে ছোট্ট স্কুলব্যাগ, চোখে রঙিন স্বপ্ন, আর মুখভরা হাসি-এই ছিল তার পৃথিবী। প্রতিদিনের মতো সোমবার সকালের নাস্তা শেষে দাদার বাড়িতে খেলতে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল সে। কে জানতো, সেই বের হওয়াই হবে জীবনের শেষ যাত্রা!

মাত্র ৩০০ গজ পথ। পরিচিত গ্রাম, চেনা মানুষ, সবার স্নেহের ইরা। কিন্তু সেই পথেই ওঁত পেতে ছিল এক নরপশু। প্রতিবেশী মো. বাবু শেখ (৫০) চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে নিয়ে যায় চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায়, প্রায় ১২৫০ ফুট উচ্চতায়। সেখানে তার ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন, এরপর গলা কেটে হত্যা চেষ্টা করা হয়।

অবিশ্বাস্য সাহস আর বাঁচার আকুতি নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পাহাড়ি জঙ্গল থেকে হেঁটে বেরিয়ে আসে ইরা। পথচারীরা দেখে বিস্মিত হয়ে যান। তাদের সামনে এসে কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু কাটা শ্বাসনালী তাকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। কেউ বুঝতে পারেনি তার আর্তনাদ। গলায় গামছা পেঁচিয়ে দ্রুত তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে ছোট্ট ইরা। মাঝরাতে ইশারায় কথা বলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শ্বাসনালী প্রায় চার ইঞ্চি কাটা! কথাগুলো আর স্পষ্ট হয়নি। অবশেষে মঙ্গলবার ভোররাতে হাসপাতালের বেডেই নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ। সীতাকুণ্ডের কুমিরার মসজিদ্দা গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। বাতাস ভারী কান্নায়, আকাশে শোকের ছায়া। বাবা মনিরুল ইসলাম একজন অটোরিকশা চালক মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, আমার ছোট্ট মেয়েটির কী দোষ ছিল?

মা রোকেয়া বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে ইরা ছিল দ্বিতীয়। দাদার বাড়ির আদরের নাতনি। দাদীর স্নেহ, চাচাদের আদর, চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে খেলাধুলায় ভরা ছিল তার দিনগুলো। প্রায়ই দাদার বাড়ি থেকে ফিরতে চাইতো না সে। সেই শিশুটি আজ নিথর।

শিশুটির চাচা আব্দুল আজিজ বলছেন, তাদের পরিবার বসবাস করে সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরার মাস্টারপাড়ায়। আর যেখানে তার ভাতিজিকে পাওয়া গেছে সেটি হলো ইকোপার্কের অনেক ভেতরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা।

মঙ্গলবার বিকেল থেকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, খাবারের প্রলোভনে অভিযুক্ত বাবু শেখ ইরার হাত ধরে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পাহাড়ের দিকে উঠছে। এই ভিডিওর সূত্র ধরেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

জেলারপুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন জানান, পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই এই নৃশংসতা। চকলেট, রক্তমাখা জামা ও হত্যার কাজে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অভিযুক্ত একাই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তবে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চিকিৎসকদের লড়াই, কিন্তু…চিকিৎসকরা জানান, ইরার অবস্থা শুরু থেকেই সংকটাপন্ন ছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে; পরবর্তী পরীক্ষায় নির্যাতনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। দুই দিন অপারেশন, নিবিড় পরিচর্যা-সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলো। ছোট্ট একটি হৃদয় আর লড়তে পারলো না।

ইরার স্কুল মসজিদ্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ নীরব। তার খালি বেঞ্চ, বইয়ের পাতায় অর্ধেক আঁকা ফুল, অসমাপ্ত হোমওয়ার্ক সবই যেন প্রশ্ন করে-এভাবেই কি থেমে যাবে একটি শিশুর স্বপ্ন? গ্রামবাসীর চোখে দেখা গেছে ক্ষোভ, বুকে শোক। সবাই একটি কথাই বলছে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102