বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন

চীনা পুরুষদের প্রেমের ফাঁদে পাচার হচ্ছে তরুণীরা

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

চীন বিশ্ব মানচিত্রে একটি পরাশক্তি দেশ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির এই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব প্রায় ৫ হাজার ৫৩০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে সম্প্রতি প্রেমের টানে বাংলাদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন একাধিক চীনা নাগরিক। অনেক ক্ষেত্রে শুধু তারা প্রেমেই সীমাবদ্ধ নয় তারা বিয়েও করছেন।

 

প্রশ্ন উঠেছে, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এই দেশের নাগরিকরা কেন বিয়ের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছেন? আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, অন্য কোনো দেশের নাগরিকদের তুলনায় চীনা নাগরিকদের এ ধরনের ঘটনা বেশি চোখে পড়ছে। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, তাদের প্রায় সবাই পুরুষ। নারী চীনা নাগরিকের এমন কোনো ঘটনার নজির নেই। বাংলাদেশে এসে তাদের প্রেম, বিয়েকে ঘিরে তাই জনমনে তৈরি হয়েছে গভীর কৌতূহল ও নানা প্রশ্ন।

 

আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশি নারীদের সহজ সরলতা ও দারিদ্র্যকে পুঁজি করেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও উইচ্যাটের মাধ্যমে সম্প্রতি চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশি তরুণীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। একপর্যায়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তারা বাংলাদেশে আসে এবং নারীদের চীনে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালায় এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়।

 

সম্প্রতি কৌতূহল সৃষ্টি করেছে মেহেরপুর জেলার একটি ঘটনা। সদর উপজেলার আমদহ ইউনিয়নের টেংরামারী গ্রামে আসেন দুই চীনা নাগরিক। তাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে ফেসবুকে প্রেমের সম্পর্ক হয় স্থানীয় মৃত লিটনের কন্যা মরিয়ম খাতুনের (১৬) সঙ্গে। আর এই সূত্র ধরেই তারা ওই এলাকায় আসেন।

 

জানা যায়, শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে চীনা চেহারার দুই ব্যক্তি গ্রামে এসে মরিয়মের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গ্রামে অপরিচিত ও ভিন্ন চেহারার দুই ব্যক্তিকে দেখে এলাকাবাসীর মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় একজন জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন। খবর পেয়ে পার্শ্ববর্তী সাহেবপুর পুলিশ ক্যাম্পের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।

 

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চীনা নাগরিক আবদুল্লাহ ও মরিয়মের পরিবারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে চীনা নাগরিকরা ওই বিয়েতে সম্মতি না জানিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় পুলিশ ওই দুই চীনা নাগরিকের কোনো পরিচয়পত্র সংরক্ষণ করেনি কিংবা কাউকে আটকও করেনি। পরে জানা যায়, তারা নিজেদের পরিচয় গোপন করে ‘চাকমা’ নাম ব্যবহার করে রয়েল এক্সপ্রেস পরিবহনের টিকিট কেটে মেহেরপুর ত্যাগ করেন।

 

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মেহেরপুর সদর থানার সাহেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই শফিক বলেন, ‘৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি দুজন চীনা নাগরিক এসেছেন। পরে তাদের বুঝিয়ে দুপুর ২টার রয়েল এক্সপ্রেস পরিবহনে করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

 

তবে কেউ কেউ মনে করছেন, এটি একটি প্রতারক চক্র। তাই বিয়ের বিষয়টি সামনে আসাতেই তারা পালিয়ে গেছেন।

 

এদিকে একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে জামালপুরে। ফেসবুকে এক মাসের প্রেমের সূত্র ধরে বাংলাদেশে আসা চীনা নাগরিক ওয়াং নাং (৩২) বিয়ে না করেই নিজ দেশে ফিরে গেছেন। গত মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) জামালপুরের নরুন্দি তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ তাকে ঢাকাগামী বাসে তুলে দেয়।

 

পুলিশ জানায়, চীনের সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা ওয়াং নাং জামালপুরের বাঁশচড়া এলাকার এক তরুণীর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়ের পর বাংলাদেশে আসেন। নিজেকে নাস্তিক পরিচয় দিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অনিচ্ছা জানানোর কারণে মেয়ের পরিবার বিয়েতে সম্মতি দেয়নি। তিনি এক মাস মেয়াদি ভ্রমণ ভিসায় দেশে এসেছিলেন।

 

আরও একটি আলোচিত ঘটনা দিনাজপুরের বিরলের। চীনা নাগরিক ইয়ং সাও সাও (৩৬) এর সঙ্গে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণী সুরভী আক্তারের পরিচয় হয়। এই সম্পর্ক বছর পার হওয়ার পর প্রেমের টানে গেল বছরের ৪ আগস্ট বাংলাদেশে এসে ইয়ং সাও সাও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুরভীকে বিয়ে করেছেন।

 

গত বছরের ২৩ জুলাই মাদারীপুরে খেয়াঘাটের এক মাঝির মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের প্রেমের টানে সেখানে আসেন চীনের নাগরিক সিতিয়ান জিং। পরদিন তিনি সুমাইয়াকে বিয়ে করেন এবং এক মাস শ্বশুরবাড়িতেই থাকেন। পরে আবার চীনে চলে যান। তবে তাদের ঘটনাটি এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে তা জানার চেষ্টা করেছে রূপালী বাংলাদেশ।

 

জানা গেছে, সুমাইয়া আক্তার বর্তমানে বাড়িতেই আছেন। তিনি এখন নয় আরও দু-এক বছর পর চীনে যেতে চান। কথা হয় সুমাইয়ার মায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সুমাইয়া ও আমার জামাই ভালো আছে। দোয়া করি সুস্থ থাকুক। ওদের ভালোবাসা অটুট হয়ে থাকুক।’

 

এই বিষয়ে এক প্রতিবেশী জানান, চীনের এক পোলার সঙ্গে সুমাইয়া প্রেম করছে বলে শুনছি। এরপর তার বাবা-মা তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। বিয়ের এক মাস পর তাদের জামাই সিতিয়ান জিং চীনে চলে যায়। ৬-৭ মাস পর ফিরে এসে সিতিয়ান জিং স্থানীয় একটি হোটেলে মাস খানিক থাকেন। এর মাঝে এক সপ্তাহ ঢাকায়ও ছিলেন।

 

চীনে পাচারের চেষ্টা

 

এদিকে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের চীনে পাচারের চেষ্টার অভিযোগে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর এক চীনা নাগরিকসহ দুইজনকে আটক করে পুলিশ। এ সময় তিন তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। ওই সময় পুলিশ জানায়, আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচারের তথ্য পাওয়া গেছে।

 

পুলিশের ধারণা, আটককৃতরা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সদস্য। তরুণীদের চীনে নিয়ে গিয়ে অনৈতিক ব্যবসায় জড়িত করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

 

এমন ঘটনা দেশে অহরহ ঘটছে

 

গেল বছরের সোমবার (২৬ মে) রাতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ‘স্ত্রী সাজিয়ে’ চীনে পাচারের সময় এক তরুণীকে উদ্ধার করেছে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। এ ঘটনায় দুই চীনা নাগরিকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন যে, তাকে জোরপূর্বক চীনে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

 

এদিকে আন্তর্জাতিক বেশকিছু গণমাধ্যম চীনা নাগরিকদের অনলাইনে সম্পর্ক করে বিয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছে। বলা হচ্ছে, অনেক সময় এসব সম্পর্কের আড়ালে অবৈধভাবে মানবপাচারের ঝুঁকি থাকতে পারে।

 

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও প্রেমের টানে বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা, পরিবারকেন্দ্রিক নজরদারি এবং অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ এখন খুব দরকার।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102