বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার (SAR) চিরাচরিত মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত ১ জুলাই ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া বিশ্বব্যাংকের নতুন শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী, আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির হিসাব থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির যে চিত্র ফুটে উঠছে, তাতে বাংলাদেশ ও ভারতই মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির নতুন সমীকরণ রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে বাদ দেওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৬.২ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৬.৫ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ আসবে বাংলাদেশ থেকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি এক লাফে ৬.১ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৬ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধি ৪.৬% হওয়ার কথা বলা হলেও ২০২৭ সালের পূর্বাভাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি এক লাফে ৬.১ শতাংশে পৌঁছাবে। তবে এই প্রবৃদ্ধির প্রধান শর্ত হিসেবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং নতুন সরকারের পক্ষ থেকে কাঠামোগত সংস্কার (Structural Reforms) বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে বাদ দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেগুলো হল- আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তর: পাকিস্তান বাদ পড়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত ও স্পষ্ট হবে।
বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ: আগে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা যে ঝুঁকি দেখতেন, নতুন এই ‘নিট’ (Clean) দক্ষিণ এশীয় পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের বেশি আকৃষ্ট করবে।
প্রবৃদ্ধির ভরকেন্দ্র: রিপোর্টে ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির প্রধান ইঞ্জিন বলা হলেও ভারতের বাইরে থাকা দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৫.৬ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা রাখবে বাংলাদেশ।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে কিছু ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ (অপ্রকাশিত) ও কিছু ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।
রপ্তানিতে শুল্ক ঝুঁকি: ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক (Tariff) বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির এই অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে আঘাত করতে পারে।
কর্মসংস্থান ‘প্যারাডক্স’: রিপোর্টে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেওয়া হয়েছে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এই অঞ্চলে অ-কৃষি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি প্রয়োজনের তুলনায় মন্থর থাকবে। এটি ২০২৬-এর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যদি বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় এবং নতুন সরকার কাঠামোগত সংস্কার শুরু করে, তবে এই ‘নতুন দক্ষিণ এশিয়ায়’ বাংলাদেশ এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে বলে বিশ্বব্যাংকের নথিতে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র: গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস, জানুয়ারি ২০২৬; বিশ্বব্যাংক।