সুনামগঞ্জের ছাতকে জনতার হাতে মারধরের পর পুলিশের কাছে হস্তান্তর এবং পরে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মধ্যে আলোচিত হাজী স্বপন মিয়াকে (৫২) রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে ফের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে বনানী এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তাকে ছাতক থানার একটি নিয়মিত মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
হাজী স্বপন মিয়া দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সারপিন নগর গ্রামের মৃত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানের ছেলে। বর্তমানে তিনি ছাতক পৌর শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ছোরাবনগর আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
জনতার হাতে মারধরের পর পুলিশের হেফাজতে
এর আগে রোববার রাতে ছাতক শহরের তাহির প্লাজার সামনে হাজী স্বপনকে স্থানীয় কয়েকজন মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সেখানে আসার পর কয়েকজন তাকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করেন।
খবর পেয়ে ছাতক থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হেফাজতে নেয়। পরে আহত অবস্থায় তাকে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য পুলিশি নিরাপত্তায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে মানববন্ধন
হাসপাতালে নেওয়ার পর হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে,এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়।এর প্রতিবাদে ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে ছাতক শহরের মধ্যে বাজার এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন থেকে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানের প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। এতে ছাতক পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর জসিমউদ্দীন সুমেন, পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন সালমান, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাকি বিল্লাহসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার
তবে হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমান। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। বরং মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় তার অবস্থান শনাক্ত করে ঢাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় ছাতক থানার একটি দল ঢাকায় অভিযান পরিচালনা করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হাজী স্বপনের অবস্থান শনাক্ত করার পর বনানী এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পরে একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যে মামলায় গ্রেপ্তার
পুলিশ জানিয়েছে, ছাতক থানার মামলা নম্বর-২৮, ২২ জুলাই ২০২৫-এর মামলায় হাজী স্বপনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলায় The Special Power Act-1974-এর ১৫(৩)/২৫-ডি ধারার উল্লেখ রয়েছে। মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আরও দুই মামলার তথ্য
পুলিশের নথি অনুযায়ী, হাজী স্বপনের বিরুদ্ধে ছাতক থানায় আরও দুটি মামলার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ছাতক থানার এফআইআর নং-৩১/১৬১, ২৯ মে ২০২১; জিআর নং-১৬১/২০২১ মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৬/৪২০/৫০৬(২) ধারার উল্লেখ রয়েছে।অন্যদিকে, ছাতক থানার এফআইআর নং-৬/১৫৪, ২ জুন ২০১৮; জিআর নং-১৫৪/২০১৮ মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৬/৪২০/১০৯ ধারার উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে হাজী স্বপনের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে বালু ব্যবসা, নদী থেকে বালু উত্তোলন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিভিন্ন অভিযোগের কথাও আলোচিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এসব বিষয়ে হাজী স্বপনের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। জনতার হাতে মারধরের পর পুলিশ হেফাজতে নেওয়া, তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ, এ নিয়ে ওসির প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন এবং এর পরদিন ঢাকার বনানী থেকে তাকে গ্রেপ্তার, ঘটনার ধারাবাহিকতা নিয়ে ছাতকে নানা আলোচনা চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হাজী স্বপনকে নিয়মিত মামলায় আটক দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং মামলার আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মামলায় আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আইনগতভাবে দোষী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।