কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ শামছুল হকের বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতা, সরকারি খাসজমি ও জলাশয় দখল, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থে বেসরকারি প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করা হয়েছে।
দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া লিখিত আবেদনে মেঘনা উপজেলার লুটেরচর ইউনিয়নের সোনারচর মৌজায় ‘শ্যামলিমা সমবায় সমিতি’ নামে গড়ে ওঠা প্রকল্পটির জমি ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় শত বিঘা জমির ওপর প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে। এর বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক এক হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রকল্পটির জমি কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং এর সম্পদের বৈধ উৎস কী—তা অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী।
আবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পটির চেয়ারম্যান হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাবেক ইউএনও মোহাম্মদ শামছুল হকের নাম স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। তবে এ তথ্যের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার অনুরোধ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, মোহাম্মদ শামছুল হক ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মেঘনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালে লুটেরচর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে জমি ক্রয়, দখল কিংবা দখলের চেষ্টা করেছেন বলে একাধিক ভূমিমালিক অভিযোগ করেছেন। একই সময়ে সরকারি খাসজমি, নদী ও জলাশয় ভরাট এবং সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।
আবেদনে লুটেরচর ইউনিয়নের মিজানুর রহমানের প্রায় সাড়ে ২০ শতক জমি দখলের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ওই জমিতে সাইনবোর্ড স্থাপন ও চাষাবাদ শুরু করার পর কয়েক দফায় সাইনবোর্ড ও সীমানার খুঁটি ফেলে দেওয়া হয় এবং চারাগাছ কেটে ফেলা হয়।
এ ছাড়া নজুর মাস্টারের ছেলে কামাল হাউদের প্রায় ৩২ শতক, বাদশা মিয়ার ছেলে আহাম্মদ মিয়ার প্রায় ৮ শতক, খালেক মিয়ার ছেলে আলী হোসেনসহ আরও কয়েকজনের মোট প্রায় ১১৪ শতক জমি, যার আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি টাকা, জোরপূর্বক দখলের অভিযোগও আবেদনে করা হয়েছে। এসব জমির মালিকানা, রেকর্ড, দলিল, নামজারি ও দখলের ইতিহাস যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
‘শ্যামলিমা’ প্রকল্পের জমির মধ্যে সরকারি খাসজমি, নদী বা জলাশয় রয়েছে কি না এবং নদী-জলাশয় ভরাট করে প্রকল্পের জমির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে কি না, তা ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, স্যাটেলাইট চিত্র ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রকল্প এলাকায় প্রশস্ত সড়ক, গাইডওয়াল, ফলদ গাছসহ বিভিন্ন অবকাঠামো রয়েছে। এসব অবকাঠামোর বেশির ভাগ সরকারি অর্থে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সাবমার্সিবল টিউবওয়েল স্থাপনের কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ, প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার ও অর্থ ছাড়ের নথি যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
সাবেক ইউএনও মোহাম্মদ শামছুল হকের বিরুদ্ধে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগও করা হয়েছে। ঢাকার শান্তিনগরে শত কোটি টাকা মূল্যের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামে-বেনামে সম্পদ ও বিপুল পরিমাণ জমি থাকার অভিযোগের কথা উল্লেখ করে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি এবং ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতাধীন কয়েকটি জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলার নথি সংগ্রহ করে জমি ক্রয়, অধিগ্রহণ, দখল ও হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনকারী বলেছেন, স্থানীয় অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগ করা হয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না গিয়ে দুদকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
আবেদনে ‘শ্যামলিমা সমবায় সমিতি’র প্রকৃত মালিকানা, জমির পরিমাণ ও সম্পদ অর্জনের উৎস অনুসন্ধান, সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের অভিযোগ যাচাই, সরকারি অর্থে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের সত্যতা পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জ্ঞাত আয় ও অর্জিত সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা বা অসত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন আবেদনকারী।