শুক্রবার (৮ মে) দিবাগত রাতে উপজেলার রাউতকোনা গ্রামে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতরা হলেন: ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন খানম, তাদের তিন কন্যাসন্তান—মিম খানম, উম্মে হাবিবা ওরফে মারিয়া, দেড় বছরের শিশু ফারিয়া এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মোল্লা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কাতারপ্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকতেন প্রাইভেটকার চালক ফোরকান মিয়া। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সেখানে বসবাস করতেন তিনি। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাদের বাসায় বেড়াতে আসেন শ্যালক রসুল মোল্লা। রাতে পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক চলাফেরা দেখা গেলেও শনিবার সকালে ঘর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়।
পরে স্থানীয়রা ঘরে ঢুকে রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পাশাপাশি পিবিআই, সিআইডি, ডিবি ও থানা পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করে।
নিহতদের স্বজনদের দাবি, ফোরকান মিয়া দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন এবং এ নিয়ে পরিবারে কলহ চলছিল। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রাশিদাকে ফোন করে জানান, তিনি পাঁচজনকে হত্যা করে পালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে আছে তিন শিশুকন্যার গলা কাটা মরদেহ। বিছানার ওপর ছিল রসুল মোল্লার নিথর দেহ। আর জানালার গ্রিলের সঙ্গে হাত বাঁধা ও মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় ঝুলছিল শারমিনের মরদেহ।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় মদের খালি বোতল, কোকাকোলার বোতল এবং রান্না করা পায়েশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া মরদেহের পাশে কিছু প্রিন্ট করা কাগজ পাওয়া যায়। সেগুলো পর্যালোচনা করে জানা যায়, ফোরকান মিয়া এর আগে গোপালগঞ্জ সদর থানায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও পরকীয়ার অভিযোগ এনে একটি লিখিত আবেদন করেছিলেন।
অভিযোগপত্রে যা উল্লেখ ছিল
অভিযোগপত্রে বলা হয়, বিয়ের পর থেকে শারমিন ধাপে ধাপে ফোরকানের উপার্জিত প্রায় ১০ লাখ টাকা নিয়ে বাবার বাড়িতে জমি কেনেন। এ ছাড়া অভিযোগে দাবি করা হয়, ফোরকান বাড়ির বাইরে থাকায় শারমিন তার এক খালাতো ভাই রাজুর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি তিনি তার মেয়ে উম্মে হাবিবার কাছ থেকে জানতে পারেন বলে উল্লেখ করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরকীয়ার প্রতিবাদ করায় গত ৩ মে সন্ধ্যায় তাকে একটি কক্ষে হাত-পা বেঁধে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনায় স্ত্রী, শ্বশুরসহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি, আর্থিক বিরোধ ও পরকীয়াজনিত সন্দেহ— সবগুলো বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় পুরো রাউতকোনা গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। স্থানীয়দের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
প্রতিবেশীরা বলেন, নেশা একটা পরিবারকে শেষ করে দিল। ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পরিবারের কর্তা ফোরকান মিয়াই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন। মাদক, পরকীয়া ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধকে সামনে রেখে তদন্ত চলছে।
তিনি আরও জানান, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পিবিআই, সিআইডি, ডিবি ও থানা পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুইজনকে আটক করা হয়েছে। তারা ফোরকানের সঙ্গে গাড়ি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বিশেষ করে শিশুদের মরদেহ দেখে খুব কষ্ট পেয়েছি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে দ্রুত হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ মরদেহগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে কাপাসিয়াজুড়ে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও শোক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা দ্রুত হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।







