মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ১১:৩২ অপরাহ্ন

মর্গে চার দিন পড়ে থাকা বাবার মরদেহ, শেষ পর্যন্ত এল না ছেলে

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে চার দিন পড়ে থাকা বাবার মরদেহ নিতে আসবেন বলে আশ্বাস দিয়েও শেষ পর্যন্ত আসেননি খোকন মিয়ার ছোট ছেলে রানা। পরে ফোন করে তিনি জানান, আর অপেক্ষা না করে যেন তার বাবার মরদেহ দাফন করে দেওয়া হয়।

সোমবার (৪ মে) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর থেকে খোকন মিয়ার ছেলে রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই; তার বাবার মরদেহ দাফন করে ফেলতে। অথচ এর আগের দিন রোববার (৩ মে) অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে রাজি করানো হয়েছিল, যেন অন্তত শেষবারের মতো এসে বাবার মরদেহ গ্রহণ করে নিজ এলাকায় দাফনের ব্যবস্থা করেন। এ জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের পক্ষ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে শুরু করে কাফন-দাফনের সব ধরনের খরচ বহনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজন ছিল শুধু একজন সন্তানের শেষবারের মতো বাবার পাশে এসে দাঁড়ানো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতিও রক্ষা হয়নি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে টানা ৩৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে অর্থোপেডিক্স বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খোকন মিয়া (আনুমানিক বয়স ৫০)। কিন্তু মৃত্যুর পরও জোটেনি আপনজনের শেষ স্পর্শ।

পরিবারের সদস্যরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তারা খোকন মিয়ার মরদেহ গ্রহণ করবেন না। ফলে মৃত্যুর পর চারটি দীর্ঘ দিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকে তার নিথর দেহ। যেন শেষবারের মতো অপেক্ষা করছিল- কেউ একজন আসবে, পরিচিত কোনো হাত ছুঁয়ে দেবে, কেউ বলবে, “চলো বাবা, এবার বাড়ি যাই।” কিন্তু কেউ আসেনি।

এর আগে শুক্রবার (১ মে) সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার উদ্যোগে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হয়। পরে দেবিদ্বার থানার পুলিশ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, গত ১০-১২ বছর ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই এবং তারা মরদেহ গ্রহণেও অনাগ্রহী। আইনি সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও মানবিকতার জায়গা থেকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করা হয়। আশা ছিল, হয়তো শেষ মুহূর্তে রক্তের সম্পর্কের টান জেগে উঠবে। কিন্তু সেই আশাও শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়।

এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে, যদি আর কেউ না আসে, তবে আগামীকাল মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে খোকন মিয়াকে বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে দাফন করা হবে।

খোকন মিয়ার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের করুইন গ্রামে হলেও তার পৈতৃক বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। স্ত্রী ও দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ সময়টুকু তাকে কাটাতে হয়েছে চরম অবহেলা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ মার্চ গুরুতর সংক্রমণ (সেলুলাইটিস) নিয়ে পুলিশ তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। দীর্ঘ ৩৮ দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসক ও নার্সরা তার সেবায় নিরলস চেষ্টা চালান। হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের ইনচার্জ তাহমিনা আক্তারসহ সিনিয়র স্টাফ নার্সরা দিনরাত চেষ্টা করেছেন তাকে বাঁচিয়ে রাখতে। তবে শেষ পর্যন্ত জীবন মৃত্যুর কাছে হার মানে।

মৃত্যুর আগে খোকন মিয়া স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারতেন না। অস্পষ্ট কণ্ঠে শুধু নিজের নাম, বাবার নাম এবং কুমিল্লার একটি ঠিকানার কথা বলেছিলেন। সেই সূত্র ধরে জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। যোগাযোগ করা হলে তার স্ত্রী নিলুফা আক্তার এবং দুই ছেলে রাজু ও রানা চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি মৃত্যুর আগেই জানিয়ে দেন, মরদেহও তারা গ্রহণ করবেন না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ওসি শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের মরদেহ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাই আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

দেবিদ্বার থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই এবং তারা মরদেহ গ্রহণে অপারগ।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জি. মো. আজহার উদ্দিন বলেন, ‘আমরা মানবিকতার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, যেন অন্তত পরিবারের কেউ এসে শেষ বিদায় জানায়। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে দাফনের সব ব্যয় বহনের প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনগত ও মানবিক- দুই দিক বিবেচনায় রেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিবারের অনাগ্রহের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মাধ্যমে খোকন মিয়ার মরদেহ দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102