ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মানেই ত্যাগের মহিমা। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু জবেহ করার পর সেই পশুর মাংস সঠিকভাবে বন্টন করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কোরবানির মাংস বন্টনের ক্ষেত্রে দরিদ্র ও আত্মীয়-স্বজনদের হক বা অধিকারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
ঈদুল আজহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পশুর মাংস বন্টন। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কোরবানি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এর মাধ্যমে সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
মাংস বন্টনের সঠিক পদ্ধতি
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কোরবানির মাংস বন্টনের মুস্তাহাব বা উত্তম পদ্ধতি হলো মাংসকে তিনটি ভাগে ভাগ করা:
১. নিজের জন্য: এক ভাগ কোরবানিকারী তার নিজের ও পরিবারের জন্য রাখবেন।
২. আত্মীয়-স্বজনের জন্য: এক ভাগ তার নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশী বা বন্ধুদের মাঝে বিলিয়ে দেবেন।
৩. অভাবী মানুষের জন্য: এক ভাগ সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও দুস্থ মানুষের মধ্যে বন্টন করবেন।
তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক সংখ্যা নয়; যদি কারো পরিবার বড় হয়, তবে তিনি নিজের জন্য বেশি রাখতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কোরবানির একটি বড় উদ্দেশ্য হলো আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।
আত্মীয় ও প্রতিবেশীর অধিকার
কুরআন ও হাদিসে নিকটাত্মীয় এবং প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, কোরবানির মাংস কেবল প্রভাবশালী আত্মীয়দের দেওয়া হয়, কিন্তু গরিব আত্মীয়রা বঞ্চিত হন। ইসলাম এটি সমর্থন করে না। আত্মীয়দের মধ্যে যারা অভাবী, তাদের মাংস পৌঁছানো দ্বিগুণ সওয়াবের কাজ—একদিকে কোরবানির হক আদায়, অন্যদিকে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা (সিলাহ রেহমি)।
দরিদ্রদের হকের সামাজিক গুরুত্ব
কোরবানির অন্যতম বড় শিক্ষা হলো সামাজিক বৈষম্য দূর করা। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা অভাবের কারণে সারা বছর মাংস কিনে খাওয়ার সুযোগ পান না। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- “তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।” (সূরা হজ: ২৮)
তাই কোরবানির মাধ্যমে যেন সমাজের কোনো মানুষ ক্ষুধার্ত না থাকে এবং সবাই যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রতিটি মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব।
কিছু জরুরি মাসয়ালা
শরিকি কোরবানি: যদি কয়েক জন মিলে একটি গরু বা মহিষ কোরবানি দেন, তবে মাংস বন্টনের আগে অবশ্যই দাঁড়িপাল্লা দিয়ে সমান ভাগে ওজন করে ভাগ করতে হবে। আনুমানিকভাবে ভাগ করা শরিয়ত সম্মত নয়।
চামড়ার টাকা: কোরবানির পশুর চামড়া বা তার বিক্রিত অর্থ এতিম, মিসকিন ও অভাবীদের দান করা ওয়াজিব। এটি নিজের কোনো কাজে বা মসজিদের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা যাবে না।
কসাইয়ের মজুরি: পশুর মাংস বা চামড়া দিয়ে কসাইয়ের পারিশ্রমিক পরিশোধ করা নিষেধ। তাকে আলাদাভাবে টাকা দিয়ে পারিশ্রমিক দিতে হবে।
কোরবানি দাতার অন্তরে যদি এই বিশ্বাস থাকে যে, মাংস নয় বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছায় কেবল তার ‘তাকওয়া’ বা পরহেজগারী, তবেই তার কোরবানি সার্থক হবে। মাংস বন্টনের এই বিধান যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে আমরা সমাজে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি।