মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশির নিচে হাজার হাজার বছর ধরে প্রবহমান এক অলৌকিক ঝরনাধারা-পবিত্র জমজম। ইসলামের ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এই কূপ কেবল মুসলমানদের কাছে পবিত্রই নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের কাছেও এক বড় বিস্ময়। প্রতি বছর হজের মৌসুমে কোটি কোটি লিটার পানি উত্তোলনের পরেও এর তলদেশ কখনো শুকিয়ে যায় না।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে মক্কার জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে যান। তৃষ্ণার্ত শিশুপুত্রের কান্নার এক পর্যায়ে আল্লাহর কুদরতে তাঁর পায়ের নিচ থেকে পানির একটি ধারা প্রবাহিত হয়। বিবি হাজেরা পাথর দিয়ে পানি আটকে দেওয়ার সময় বলেছিলেন ‘জমজম’ (থামো থামো)। সেই থেকেই এর নাম জমজম।
বিজ্ঞানের চোখে জমজম: কেন এটি অনন্য?
সাধারণ কূপের পানি কিছুদিন ব্যবহার না করলে তাতে শ্যাওলা বা দুর্গন্ধ হয়, কিন্তু জমজমের পানি হাজার বছরেও কখনো নষ্ট হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে:
খনিজ উপাদানের সমৃদ্ধি: এই পানিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সল্ট-এর পরিমাণ সাধারণ পানির চেয়ে বেশি, যা ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।
প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা: জমজম পানিতে প্রাকৃতিক ফ্লোরাইড থাকায় এতে কোনো ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু জন্মাতে পারে না।
ক্ষুধা নিবারক: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জমজম পানি যে যে নিয়তে পান করবে, তা তার জন্যই কবুল হবে। এটি কেবল তৃষ্ণা মেটায় না, ক্ষুধাও নিবারণ করে।
আধুনিক ব্যবস্থাপনা: কিং আব্দুল্লাহ জমজম প্রজেক্ট
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে জমজম কূপের পানি ব্যবস্থাপনা করা হয়।
উত্তোলন: শক্তিশালী পাম্পের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮ হাজার লিটার থেকে শুরু করে ১১ থেকে ১৯ লিটার পর্যন্ত পানি উত্তোলন করা যায়।
পরিশোধন: অতিবেগুনি রশ্মি (UV rays) ব্যবহার করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পানি পরিশোধন করা হয় যাতে এর প্রাকৃতিক স্বাদ ও গুণাগুণ অপরিবর্তিত থাকে।
সরবরাহ: মক্কা থেকে মদিনার মসজিদে নববী পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে এই পানি প্রতিদিন পৌঁছে দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি স্বয়ংক্রিয় রোবট এবং স্মার্ট কন্টেইনারের মাধ্যমে হাজীদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
জমজম নিয়ে কিছু অবাক করা তথ্য
১. এই কূপটি মাত্র ১৮ ফুট লম্বা এবং ১৪ ফুট চওড়া।
২. মাত্র ৫ ফুট গভীরতা থেকে পানি আসা শুরু হয়।
৩. কয়েক হাজার বছর ধরে বিরতিহীনভাবে পানি দেওয়ার পরেও এর পানির স্তর কখনো আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নামে না।
জমজম পানি আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। বিশ্বের আধুনিক সব পানি শোধনাগার বা ল্যাবরেটরি এই পানির গুণাগুণের রহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারেনি। বিশ্বাসীদের জন্য এটি শেফা, আর বিজ্ঞানীদের জন্য এক অন্তহীন বিস্ময়।