উপকূলীয় অঞ্চলে যারা বাস করেন বা যারা সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণে যান, তারা লক্ষ্য করেছেন যে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সমুদ্রের পানি তীরের দিকে আছড়ে পড়ে, আবার কয়েক ঘণ্টা পরেই তা অনেক দূরে সরে যায়। পানির এই ফুলে ওঠাকে আমরা বলি ‘জোয়ার’ আর নেমে যাওয়াকে বলি ‘ভাটা’। যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রকৃতির এই রহস্যময় আচরণের পেছনে রয়েছে মহাজাগতিক শক্তি ও বিজ্ঞানের নিখুঁত হিসাব।
কেন হয় জোয়ার-ভাটা?
জোয়ার-ভাটা হওয়ার প্রধান কারণ মূলত দুটি:
১. চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষ শক্তি (Gravitational Pull): মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব অনেক বেশি হলেও চাঁদের দূরত্ব তুলনামূলক কম। ফলে পৃথিবীর ওপর চাঁদের আকর্ষণ শক্তি সূর্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ কার্যকরী হয়। এই আকর্ষণের ফলেই সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে।
২. পৃথিবীর আবর্তন ও কেন্দ্রাতিগ শক্তি (Centrifugal Force): পৃথিবী তার নিজ অক্ষের ওপর অনবরত ঘুরছে। এই ঘূর্ণনের ফলে একটি কেন্দ্রবিমুখ বল বা শক্তির সৃষ্টি হয়, যা পানিকে বাইরের দিকে ঠেলে দিতে চায়। এটিও জোয়ার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।
জোয়ার-ভাটার প্রকারভেদ
মুখ্য জোয়ার: চাঁদ পৃথিবীর যে অংশের ঠিক সামনে থাকে, সেখানে চাঁদের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি হয়। ফলে সেই অংশের পানি প্রবলভাবে ফুলে ওঠে। একে বলা হয় মুখ্য জোয়ার।
গৌণ জোয়ার: চাঁদের ঠিক বিপরীত দিকে পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ শক্তির প্রভাবে পানি ফুলে ওঠে, যাকে বলা হয় গৌণ জোয়ার।
ভরা কটাল বা তেজ কটাল: অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে। তখন চাঁদ ও সূর্যের মিলিত আকর্ষণে জোয়ারের বেগ অনেক বেড়ে যায়। একেই বলা হয় ভরা কটাল।
মরা কটাল: অষ্টমীর চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর সাথে সমকোণে অবস্থান করে, তখন আকর্ষণ শক্তি ভাগ হয়ে যায়। ফলে জোয়ারের পানি খুব একটা বাড়ে না, একে মরা কটাল বলে।
সময়ের ব্যবধান
পৃথিবী তার অক্ষের ওপর একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু চাঁদও নিজ কক্ষপথে খানিকটা এগিয়ে যায়। ফলে কোনো স্থানে একবার জোয়ার হওয়ার পর ঠিক সেই স্থানে আবার জোয়ার হতে সময় লাগে ১২ ঘণ্টা ২৬ মিনিট। অর্থাৎ, প্রতিদিন দুবার জোয়ার ও দুবার ভাটা হয় এবং প্রতিদিনের জোয়ার আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৫২ মিনিট পরে হয়।
নদীতে জোয়ার-ভাটার প্রভাব
সাগরের জোয়ারের পানি যখন মোহনা দিয়ে নদীর ভেতরে প্রবেশ করে, তখন নদীর পানিও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলে বিশেষ করে সুন্দরবন ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে নদীর জোয়ার-ভাটা কৃষিকাজ ও নৌ-চলাচলের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি অনেক সময় লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, যা পরিবেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বর্তমানে জোয়ার-ভাটার এই বিপুল শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ‘টাইডাল এনার্জি’ বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এছাড়া জোয়ারের সময় বড় জাহাজগুলো বন্দরে ভিড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
জোয়ার-ভাটা কেবল একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়, এটি পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা এবং সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান টিকিয়ে রাখার এক অপরিহার্য প্রক্রিয়া। চাঁদ-সূর্যের এই অদৃশ্য টানেই প্রতিনিয়ত স্পন্দিত হচ্ছে আমাদের নীল গ্রহের বিশাল জলরাশি।