বসন্তের আগমনী বার্তায় শিমুল-পলাশ কিংবা শীতের সকালে গাঁদা প্রকৃতিতে একেকটি ফুল ফোটে একেক নির্দিষ্ট সময়ে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, গাছ কীভাবে বোঝে যে এখন ফুল ফোটানোর সময় হয়েছে? তাদের তো কোনো হাতঘড়ি নেই বা ক্যালেন্ডারও নেই। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, গাছ আসলে অত্যন্ত দক্ষ এক ‘জ্যোতির্বিজ্ঞানী’ এবং ‘গণিতবিদ’। মূলত পরিবেশের কিছু বিশেষ সংকেত বিশ্লেষণ করেই গাছ ফুল ফোটানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
১. আলোর দৈর্ঘ্য বা ‘ফটো পিরিওড’
গাছপালার ফুল ফোটানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে দিনের আলোর দৈর্ঘ্য। একে বলা হয় ফটো পিরিওডিক রেসপন্স (Photoperiodic Response)। গাছের পাতায় থাকে ‘ফাইটোক্রোম’ নামক এক ধরনের আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন। এটি অনেকটা সেন্সরের মতো কাজ করে। যখন দিন বড় বা ছোট হতে শুরু করে, এই সেন্সরগুলো সেই পরিবর্তন ধরে ফেলে এবং গাছের ভেতরে বিশেষ হরমোন তৈরি করে।
স্বল্প দিবা উদ্ভিদ : যারা দিন ছোট হয়ে আসলে (যেমন শীতকালে) ফুল ফোটায়।
দীর্ঘ দিবা উদ্ভিদ : যারা বসন্ত বা গ্রীষ্মের বড় দিনে ফুল ফোটাতে পছন্দ করে।
২. তাপমাত্রার প্রভাব ও ‘ভার্নালাইজেশন’
কিছু কিছু গাছের জন্য কেবল আলোই যথেষ্ট নয়, তাদের প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ শীত বা ঠান্ডা। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ভার্নালাইজেশন (Vernalization)। অনেক গাছ শীতের তীব্রতা সহ্য করার পর যখন বুঝতে পারে তাপমাত্রা বাড়ছে, তখনই তারা ফুল ফোটানোর সংকেত পায়। এটি একটি প্রাকৃতিক রক্ষা কবচ, যাতে মাঝ শীতে ভুল করে ফুল ফুটে তুষারে নষ্ট না হয়ে যায়।
৩. ‘ফ্লোরিজেন’ নামক সেই জাদুকরী হরমোন
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন পাতায় এমন কিছু একটা তৈরি হয় যা ফুলের কুঁড়ি তৈরির সংকেত দেয়। সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে যে, পাতা থেকে ‘ফ্লোরিজেন’ (Florigen) নামক এক ধরনের প্রোটিন বা সংকেত কাণ্ডের ডগায় পৌঁছায়। এই সংকেত পৌঁছানোর পরই কাণ্ডের কোষগুলো পাতার বদলে ফুলের পাপড়ি তৈরিতে মনোযোগ দেয়।
৪. জিনগত সংকেত
পরিবেশগত কারণের পাশাপাশি গাছের ভেতরে থাকা নিজস্ব ‘জৈবিক ঘড়ি’ বা সার্কাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm) কাজ করে। প্রতিটি গাছের ডিএনএ-তে নির্দিষ্ট কিছু জিন থাকে যা নির্দিষ্ট বয়সে বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। খরা বা প্রতিকূল পরিবেশেও অনেক সময় গাছ তার বংশ রক্ষার তাগিদে দ্রুত ফুল ফুটিয়ে দেয়।
গাছের ফুল ফোটানো কেবল সুন্দরের প্রকাশ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত জটিল জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া। আলো, তাপমাত্রা এবং সময়ের এই নিখুঁত মেলবন্ধনই পৃথিবীকে ঋতুভেদে আলাদা আলাদা রঙে সাজিয়ে তোলে। প্রকৃতির এই ‘স্মার্ট সিস্টেম’ আজও বিজ্ঞানীদের গবেষণার এক অন্তহীন খোরাক।