বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় এলেও সম্ভাব্য সভাপতি প্রার্থীদের তালিকায় গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের ২নং সহ-সভাপতি এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েলের নাম।
দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতি এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতার কারণে সম্ভাব্য নেতৃত্বের দৌড়ে রুয়েল শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহের নান্দাইলে জন্ম নেওয়া এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েল ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০০৮ – ০৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়ে ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন তিনি। সাংগঠনিক দক্ষতা, দলের দুঃসময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সংগঠনের ভেতরে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন রুয়েল। এক পর্যায়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়াও সংগঠনের সংকটকালীন সময়ে দুইবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে বেশ আলোচনায় আসেন ইজাজুল কবির রুয়েল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে তাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংগঠনের গতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে তাকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এই দায়িত্ব পালনকালে ক্যাম্পাসে ঝিমিয়ে পড়া ছাত্রদলের কার্যক্রমে গতি সঞ্চার এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি নেতৃত্ব দেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
ছাত্রদলের রাজনীতিতে ইজাজুল কবির রুয়েলকে মূলত মাঠকেন্দ্রিক সংগঠক হিসেবেই দেখা হয়। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিটি আন্দোলন, ২৪ এর গনঅভ্যুত্থানে সরাসরি তার নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এছাড়াও বিএনপি ও ছাত্রদলের বিভিন্ন আন্দোলন, বিক্ষোভ, মিছিল এবং কর্মসূচিতে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও তার সক্রিয়তা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং সাংগঠনিক তৎপরতার কারণে সংগঠনের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বলেও মনে করছেন অনেক নেতা।
এর বাইরেও স্বচ্ছ ইমেজ ও মেধাবী ছাত্র হিসেবেও বেশ সুনাম রয়েছে ইজাজুল কবির রুয়েলের। বারংবার মামলা-হামলা, নির্যাতনের পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিজ বিভাগেও সাফল্যের সাক্ষর রাখেন রুয়েল। প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩.৭৮ পেয়ে ফাস্ট ক্লাস সেকেন্ড স্থান অধিকার করেন রুয়েল। আমেরিকা ও জাপানের নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেলেও বেছে নেন রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথ।
ইজাজুল কবির রুয়েলের রাজনৈতিক পথচলা কখনোই সুখকর ছিল না। সম্মুখ সারির মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বের কারণে আওয়ামীলীগ সরকার আমলে অসংখ্য মিথ্যা মামলা,পুলিশের হয়রানি, গ্রেফতার ও অত্যাচারের স্বীকার হয়েছেন এই নেতা।
পহেলা মার্চ দুই বছর মেয়াদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতার নাম ঘুরে ফিরছে। সংগঠনের ত্যাগী, দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় এবং সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের প্রভাবশালী সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকার কারণে ইজাজুল কবির রুয়েলের নাম সম্ভাব্য সভাপতি প্রার্থীদের তালিকায় শীর্ষে আছেন বলে দলীয় বিশ্বস্ত বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
নব্বই-পরবর্তী সময়ে ছাত্রদলের সেই আগের সাংগঠনিক শক্তি ও রাজপথের প্রভাব কিছুটা কমে গেলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংগঠনটি আবারও নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব সংগঠনের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের নতুন কমিটি কেমন হবে এবং কে নেতৃত্বে আসবেন তা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও সংগঠনের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করা নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
তবে শেষ পর্যন্ত ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বে কে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন, সে সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর।