বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের স্পিকারের চেয়ারে বসলেন এমন এক ব্যক্তি, যার পরিচয় কেবল ফাইলে নয়, বরং খেলার মাঠের ঘাসেও খোদাই করা আছে। তিনি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম।
দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এর আগে অনেক রাজনীতিবীদ স্পিকার হয়েছেন, কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ‘ফিফা’ থেকে ‘অর্ডার অফ মেরিট’ পাওয়া কোনো ফুটবলারের স্পিকার হওয়া—এটি কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসেও এক বিরল ঘটনা।
ষাটের দশকে যখন পাকিস্তান জাতীয় দলে বাঙালিদের জায়গা পাওয়া ছিল অনেকটা ‘অসম্ভব’, তখন নিজের অদম্য গতি আর গোল করার নিখুঁত ক্ষমতায় সেই বাধা ভেঙেছিলেন হাফিজ।
তিনি কেবল দলেই খেলেননি, বরং দক্ষতার সাথে পাকিস্তান ফুটবল দলের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মোহামেডানের জার্সিতে তিনি ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য স্ট্রাইকার।
এক ম্যাচে ‘ডাবল হ্যাটট্রিক’ (৬ গোল) করার সেই অবিশ্বাস্য কীর্তি আজও দেশের ফুটবলারদের কাছে রূপকথার মতো।
ফুটবলের ডামাডোলে অনেকেই ভুলে গেছেন যে হাফিজ উদ্দিন ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘দ্রুততম মানব’। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে তার সেই বজ্রগতির ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের রেকর্ডগুলো আজও প্রবীণ অ্যাথলেটদের মুখে মুখে ফেরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্লু’ পদক জয়ী এই ক্রীড়াবিদ এখন সংসদের ‘রেফারি’ বা অভিভাবক।
মেজর হাফিজের পরিচয় কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বাফুফে-র সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এএফসি-র সহ-সভাপতি এবং ফিফা ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য ছিলেন।
২০০৪ সালে ফিফা যখন তাকে বাংলাদেশের শতাব্দীর সেরা ফুটবল ব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মাননা দেয়, তখন তিনি বিশ্ব ফুটবলের এলিট ক্লাবে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন।
১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর পুরোপুরি রাজনীতিতে মন দিলেও খেলার মাঠের সেই স্পোর্টিং স্পিরিট তিনি কখনোই হারাননি। আশির দশকে এমপি এবং নব্বইয়ের দশকে সফল মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার তিনি বসলেন রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে।
ক্রীড়াঙ্গন থেকে উঠে আসা অনেক এমপি-মন্ত্রী থাকলেও স্পিকার হওয়ার অনন্য রেকর্ডটি কেবল তারই প্রথম।