দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে অকার্যকর সংসদ ও গণতান্ত্রিক সংকটের পর এবার একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে রাজপথের বদলে সংসদকেই প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিতে চায় সরকারি ও বিরোধী দল।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে সংকটের সমাধান সংসদে হবে নাকি রাজপথে তা নির্ভর করবে দলগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতা এবং আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের ওপর।
আর একদিন পরই বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন। এই সংসদ গঠনের পেছনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ভূমিকা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন। বিশেষ করে জুলাই মাসের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
২০০৮ সালের পর থেকে পরবর্তী তিনটি নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক থাকায় সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সে সময় সংসদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। তবে এবার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা দলগুলোই সরকার ও বিরোধী দলে থাকায় সংসদের কার্যক্রম কেমন হবে তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অতীতে সংসদে সরকারি দলের প্রভাব বেশি থাকায় বিরোধী দলের ভূমিকা অনেক সময় সীমিত ছিল। ফলে দাবি আদায়ে বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে রাজপথে বেশি সক্রিয় হতে দেখা গেছে। নব্বইয়ের দশক কিংবা ২০০১-০৮ সময়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল রাজপথ।
তবে এবার বিরোধী দলে থাকা জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, তারা প্রথমে সংসদের ভেতরেই বিভিন্ন সংকটের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করবে। যদিও আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন না হলে রাজপথে আন্দোলনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না দলটি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, দাবি আদায়ে জনমত গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। প্রয়োজনে মিছিল, সমাবেশ ও জনসভা করে জনগণকে সংগঠিত করা হবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করছে বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করছেন, জুলাই সনদ বা সংবিধান সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সংসদে আলোচনা হলে তা সংসদকে আরও কার্যকর করে তুলবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের আলোচনার মাধ্যমেই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব। জুলাই সনদের যেসব বিষয় সংসদে গৃহীত হবে, তা সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার ওপর। বিশেষ করে জুলাই সনদে বিরোধী দলকে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় তা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যেসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেখানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকতে হবে। এ ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে সংসদ আরও প্রাণবন্ত হবে। অন্যথায় বিরোধী দল আবারও রাজপথমুখী হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময়ের গণতান্ত্রিক সংকটের পর যদি সরকার ও বিরোধী দল সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে, তবে দেশের গণতন্ত্র আরও শক্ত ভিত্তি পাবে।