ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা। রমজানের রোজা পালনের পর ঈদুল ফিতরের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং রোজার ভুলত্রুটি মার্জনা করতে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে। ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব এবং কারা এটি পাওয়ার যোগ্য এ বিষয়ে ইসলাম ধর্মে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে।
১. ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব?
ফিতরা আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ওয়াজিব। এর নির্দিষ্ট কিছু শর্ত রয়েছে:
নেসাব পরিমাণ মালিকানা: ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় যার কাছে যাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদ (সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা/পণ্য) নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত হিসেবে থাকবে, তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব।
পরিবারের সবার পক্ষ থেকে: পরিবারের প্রধান বা কর্তা নিজের পক্ষ থেকে এবং তার ওপর নির্ভরশীল নাবালক সন্তানদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করবেন। এমনকি ঈদের দিন সুবহে সাদিকের আগে কোনো শিশু জন্ম নিলেও তার ফিতরা দিতে হবে।
রোজা রাখা শর্ত নয়: অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে কেউ রোজা রাখতে না পারলেও নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাকে ফিতরা দিতে হবে।
২. ফিতরা কাকে দেবেন? (প্রাপক কারা)
যাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরাই ফিতরা পাওয়ার উপযুক্ত। ফিতরা মূলত সমাজের দরিদ্র ও অভাবী মানুষের অধিকার।
দরিদ্র ও মিসকিন: যাদের নিকট নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এবং তারা অভাবগ্রস্ত।
অসহায় আত্মীয়-স্বজন: নিজের ভাই-বোন, চাচা, ফুফু বা অন্যান্য নিকটাত্মীয় যদি অভাবী হন, তবে তাদের দেওয়া সবচেয়ে উত্তম। (তবে মনে রাখতে হবে: বাবা-মা, দাদা-দাদি এবং নিজের সন্তানদের ফিতরা দেওয়া জায়েজ নেই)।
দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ছাত্র: অভাবী ছাত্র যারা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে, তাদেরও ফিতরা দেওয়া যাবে।
৩. কখন আদায় করবেন?
ফিতরা আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যাওয়ার আগে। তবে রমজান মাস চলাকালীন যেকোনো সময় এটি আদায় করা যায় যাতে দরিদ্র মানুষ সেই টাকা দিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে পারে। ঈদের নামাজের পর আদায় করলে তা সাধারণ দান হিসেবে গণ্য হবে, ওয়াজিব ফিতরার সওয়াব পাওয়া যাবে না।
৪. ফিতরার পরিমাণ
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী ফিতরা গম, যব, খেজুর বা কিসমিসের নির্দিষ্ট মাপে আদায় করা হয়। তবে বর্তমান সময়ে এর বাজারমূল্য হিসেবে নগদ টাকা দিয়ে আদায় করা সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর।
প্রতি বছর ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা স্থানীয় ওলামা পরিষদ সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ফিতরার হার নির্ধারণ করে দেয়। আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বনিম্ন হার বা তার বেশি (খেজুর বা কিসমিসের মূল্য অনুযায়ী) দিতে পারেন।
৫. ফিতরা আদায়ের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা
ত্রুটি বিচ্যুতি মোচন: রোজা পালনের সময় অজান্তে হয়ে যাওয়া ছোটখাটো ভুল বা অনর্থক কথাবার্তার কাফফারা হিসেবে এটি কাজ করে।
সামাজিক সাম্য: ঈদের আনন্দে যেন সমাজের দরিদ্র মানুষগুলোও অংশ নিতে পারে এবং তাদের খাদ্যের সংস্থান হয়, তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
ফিতরা কেবল একটি দান নয়, এটি ধর্মীয় দায়িত্ব। সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তিকে ফিতরা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমেই আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে