রমজান আমাদের শেখায় আত্মসংযম এবং ধৈর্যের শিক্ষা। এই মাসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভেতরে ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি জাগ্রত করা। আর তাকওয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সৃষ্টির প্রতি নমনীয় হওয়া এবং অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা। যখন একজন রোজাদার ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করেন, তখন তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কষ্ট সহজে উপলব্ধি করতে পারেন।
১. সহমর্মিতার মাস : ক্ষুধার কষ্ট ভাগ করে নেওয়া
রমজান আমাদের অন্যের অভাব বোঝার সুযোগ দেয়। সারাদিন না খেয়ে থাকার মাধ্যমে একজন সচ্ছল ব্যক্তি বুঝতে পারেন একজন অনাহারী মানুষের জীবন কতটা কঠিন। এই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় সহমর্মিতা।
হাদিসের শিক্ষা : নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘এটি সহমর্মিতার মাস।’ অর্থাৎ এ মাসে একে অপরের প্রতি দয়া ও মমতা প্রদর্শন করা ইমানের দাবি।
২. নমনীয়তা ও আচরণের উৎকর্ষ
রোজা কেবল পেটের নয়, রোজা হলো জিহ্বা ও মনের। রমজানে একজন মুমিন তার আচরণের মাধ্যমে নমনীয়তার পরিচয় দেন।
ঝগড়া-বিবাদ পরিহার : কেউ গালি দিলে বা লড়াই করতে এলে রোজাদার উত্তর দেবেন, ‘আমি রোজাদার’ (বুখারি)। এটি নমনীয়তার সর্বোচ্চ শিখর।
বিনয় প্রদর্শন : রমজানে অহংকার ত্যাগ করে সবার সঙ্গে নরম সুরে কথা বলা এবং বিনয়ী হওয়া ইবাদতেরই অংশ।
৩. অধীনদের প্রতি দয়া ও কাজের চাপ কমানো
সহমর্মিতার একটি বড় ক্ষেত্র হলো নিজের কর্মচারী বা অধীনদের প্রতি নমনীয় হওয়া। রমজান মাসে কাজের চাপ কিছুটা কমিয়ে দিয়ে তাদের ইবাদতের সুযোগ করে দেওয়া একটি মহান আমল।
রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীনদের কাজের বোঝা হালকা করে দেবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন।’
৪. সামাজিক সহমর্মিতা ও দান-সদকাহ
রমজানে রাসুল (সা.)-এর দানশীলতা প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি বেড়ে যেত। সমাজের এতিম, বিধবা ও নিঃস্ব মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই হলো প্রকৃত সহমর্মিতা।
ইফতারের অংশীদারিত্ব : নিজে যা খাচ্ছেন, তা থেকে প্রতিবেশীকে বা অভাবীকে দান করা ভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৫. বাজার ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নমনীয়তা
রমজান এলে অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন, যা ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। প্রকৃত মুমিন ব্যবসায়ী এ মাসে পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে সহমর্মিতার পরিচয় দেন। সহনশীল লাভ এবং মানুষের কষ্ট লাঘব করার মানসিকতা রমজানকে অর্থবহ করে তোলে।
রমজান আমাদের শেখায় যে, আমরা সবাই এক আল্লাহর বান্দা। উঁচু নিচু, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের প্রতি নরম হওয়া এবং সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই হলো সিয়ামের আসল সার্থকতা। আমরা যদি রমজানের এই নমনীয়তা ও মমত্ববোধ সারাবছর ধরে রাখতে পারি, তবেই আমাদের সমাজ শান্তিময় হয়ে উঠবে।