দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স এবং অন্যান্য ইস্যুতে গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করায় তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১০ দিনের মধ্যে তাদের লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
শোকজ পাওয়া তিন কর্মকর্তা হলেন— বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, নীল দল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক কর্মদিবস পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে ডাকা ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা বক্তব্য দেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, শোকজের জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর করা, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন নিয়মতান্ত্রিক দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন দলের মধ্যে একটি ঐক্য গড়ে ওঠে। এ ঐক্যের সমন্বয়ক করা হয় নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউ–এর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরীকে। তবে ১৬ ফেব্রুয়ারির সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন, সভা, সেমিনার, বক্তব্য বা বিবৃতি দেওয়ার আগে গভর্নরের অনুমোদন নিতে বাধ্য। গভর্নর বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে তোলার সুযোগ রয়েছে; সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করা বিধিসম্মত নয়। অথচ ওই দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নির্ধারিত সভার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, গভর্নর দ্রুততার সঙ্গে বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে কর্মকর্তাদের সরবরাহ করা কাগজপত্রে দেখা যায়, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানের মূল্যায়ন প্রক্রিয়াসহ আটটি এজেন্ডা নিয়ে পর্ষদ সভা আহ্বান করা হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনের পর দিনই টেলিফোনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, নির্বাচনের পর ইচ্ছাকৃতভাবে একটি পক্ষ পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করছে। পরিচালনা পর্ষদ কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা পর্ষদের আলোচনার বিষয়। এভাবে সংবাদ সম্মেলন করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সোমবার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ বলেন, ব্যাংক খাত নিয়ে গভর্নরের ‘খেয়ালি’ বক্তব্য বন্ধ করে বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন নিশ্চিত করতে হবে। তার দাবি, তুলনামূলক কম দুর্বল এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে পাঁচ ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। উল্লেখ্য, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫–এর আলোকে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সরকারি মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন চাই। তবে তা হবে প্রতিষ্ঠানের জন্য, ব্যক্তির জন্য নয়। স্বায়ত্তশাসনের অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একনায়ক বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আমরা সংবাদ সম্মেলন করেছি।’
বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে অনিয়ম–লুটপাটের অভিযোগ থাকলেও তখন কর্মকর্তারা নীরব ছিলেন—এমন প্রশ্নে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আগে বলিনি বলে এখন প্রশ্ন উঠছে। এখন না বললেও সামনে প্রশ্ন উঠত। আমরা এই দায় বয়ে বেড়াতে চাই না।’ নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো আমরা এতটা খোলামেলা হতে পারতাম না।’