গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর কক্সবাজার থেকে দায়িত্ব পাওয়া প্রথম পূর্ণমন্ত্রী তিনি। তবে তার রাজনৈতিক পথ মোটেও সহজ ছিল না। সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতিতে আসা, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পাড়ি দেওয়া এবং নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে এবার তিনি পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
একসময় সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল; দীর্ঘদিন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেই তিনিই এখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যে বাহিনী একসময় তাকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেই বাহিনীই এখন তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে দায়িত্ব পালন করবে। কক্সবাজারের রাজনীতিতে এই ঘটনাকে অনেকে ইতিহাসের এক নাটকীয় মোড় হিসেবে দেখছেন।
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে এবারসহ চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
গুম থেকে ফিরে আজ মন্ত্রিসভায়; ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদ নিখোঁজ হন। পরিবার ও দলের অভিযোগ ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে গেছে। টানা ৬২ দিন তার কোনো সন্ধান মেলেনি। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, তিনি হয়তো আর জীবিত নেই। পরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে তার সন্ধান পাওয়া যায়। শিলংয়ের কারাগারে বন্দি জীবন ও নির্বাসনে থেকে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে প্রায় ১০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট নিজ মাতৃভূমিতে সালাহউদ্দিন আহমদের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটে।
দেশে ফেরার পর জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব বাড়তে থাকে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আগেই তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক পটভূমি এবং সংগঠনের ভেতরে প্রভাব—সব মিলিয়ে তাকে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তে চমক থাকলেও বিস্ময় ছিল না বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা।
ছাত্ররাজনীতি: ১৯৬২ সালের ৩০ জুন পেকুয়া উপজেলার সিকদারপাড়া গ্রামে জন্ম সালাহউদ্দিন আহমেদের। সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিকের পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক এবং মাতা আয়েশা হক। পেকুয়ার শিলখালী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবনেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি এবং পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে।
১৯৮৫ সালে সপ্তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে নিয়োগ পান। তবে ১৯৯৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
মন্ত্রিসভায় পথচলা; ১৯৯৬ সালে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন আহমেদ। এরপর কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে একাধিকবার জয়ী হয়ে এলাকায় শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর কক্সবাজার থেকে তিনিই প্রথম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেন। দীর্ঘ দুই দশক পর এবার তিনি জেলার প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। কক্সবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটিকে নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দলীয় রাজনীতিতেও তার অবস্থান সুদৃঢ়। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং পরে দুবার সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে দলের জাতীয় কাউন্সিলে যুগ্ম মহাসচিব পদে পদোন্নতি পান। পরের কাউন্সিলে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমেদ শুধু নিজের আসনে জয়ী হননি, জেলার অন্য আসনগুলোতেও প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন। দলীয় নেতাদের দাবি, কিছু আসনে প্রার্থীরা পিছিয়ে থাকলেও তার উপস্থিতি ও আশ্বাসে পরিস্থিতি ঘুরে যায়। শেষ পর্যন্ত জেলা থেকে চারজন প্রার্থী বিজয়ী হন।
কক্সবাজারের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জানান, পেকুয়ার মেঠোপথ থেকে উঠে আসা মেধাবী সন্তান, জাতীয় নেতা সালাহউদ্দিন ভাই আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে বিসিএস ক্যাডার থেকে আবারও রাজনীতির মাঠে নেমে আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের অবদান ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। গুম থেকে ফিরে আসা, নির্যাতনের শিকার এই সমুদ্রনগরীর সাহসী নেতার নেতৃত্বে কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনে বিজয় সুনিশ্চিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও আমাদের নেতা সফল হবেন—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তারা।
কক্সবাজার জেলায় উচ্ছ্বাস; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর কক্সবাজার শহর ও চকরিয়া-পেকুয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল বের হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে একে জেলার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। কক্সবাজারের ইতিহাসে স্বাধীনতার পর তিনি প্রথম প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় জেলায় নতুন গর্ব যুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।