গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের পর বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় ‘উচ্চকক্ষ’ প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি। এই কক্ষের গঠন, সদস্যপদ এবং যোগ্যতার মাপকাঠি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও গুঞ্জন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে দলগুলোর মনোনয়নের ওপরই নির্ভর করছে কে হচ্ছেন উচ্চকক্ষের সদস্য। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নিম্নকক্ষের (জাতীয় সংসদ) নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরা উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারবেন কিনা ?
পরাজিত প্রার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ:
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, উভয় কক্ষের নির্বাচন একই সময়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নিম্নকক্ষের নির্বাচন আগেই সম্পন্ন হওয়ায় একটি বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে, শুধু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের জন্য একটি বিশেষ বিধান রাখা হচ্ছে, যেখানে এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরাও উচ্চকক্ষের সদস্য হিসেবে মনোনীত হতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের উচ্চকক্ষে মনোনয়ন দিতে পারবে। তবে এটি কেবল ত্রয়োদশ সংসদের জন্যই প্রযোজ্য হবে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার ফলে সংবিধান সংস্কার বাধ্যতামূলক হয়েছে। পরবর্তী বা চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন হবে সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী। তখন নির্বাচনের আগেই দলগুলোকে উভয় কক্ষের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে, ফলে একই ব্যক্তি উভয় কক্ষের মনোনয়ন পাবেন না। বিদ্যমান সংবিধানে উচ্চকক্ষের বিধান না থাকায় এবারের নির্বাচনের জন্য এই বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে।
উচ্চকক্ষের কাঠামো ও সদস্য নির্বাচন:
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০৫ জন। এর মধ্যে ১০০ জন সদস্য সরাসরি সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন। বাকি ৫ জন সদস্যকে রাষ্ট্রপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে মনোনয়ন দেবেন।
সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, যার মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের কার্যপরিধি:
উচ্চকক্ষ গঠিত হলে বাংলাদেশের সংসদ কার্যকরভাবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট হবে। এই কক্ষের মূল কাজ হবে প্রণীত আইন পর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করা। সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনে উচ্চকক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে। তারা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারলেও সরাসরি অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারবে না।
এছাড়া আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর তুলে ধরাও এই কক্ষের অন্যতম লক্ষ্য। দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিধান ও রাখা হয়েছে।
সংসদের নতুন বিন্যাস:
উচ্চকক্ষের আগমনে জাতীয় সংসদের আকারও পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে মোট আসন হবে ৫০৫টি। এর মধ্যে ৪০০টি আসন থাকবে নিম্নকক্ষে (৩০০টি আসনে সরাসরি ভোট এবং ১০০টি আসনে সারা দেশে সংরক্ষিত নারী প্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি ভোট)। অবশিষ্ট ১০৫টি আসন হবে উচ্চকক্ষের জন্য।