বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (আনসার-ভিডিপি) তাদের গণপ্রতিরক্ষা কার্যক্রমকে মানবিক কল্যাণে রূপান্তরিত করে দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘ফ্রি চিকিৎসাসেবা’ কর্মসূচির প্রথম পর্ব সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এই কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের প্রাক্কালে মাঠপর্যায়ের ভিডিপি সদস্য ও সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাহিনীর জনবান্ধব ও গণমুখী ভূমিকা আরও দৃঢ় করা।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সদর দপ্তর থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
তিনি বলেন, আনসার ও ভিডিপির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আগেও ছিল, তবে এবারের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসাসেবা প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
মহাপরিচালক বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আনসার-ভিডিপির সর্বাধিক সংখ্যক সদস্য-সদস্যা দায়িত্ব পালন করবেন। এই প্রেক্ষাপটে ২৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া চিকিৎসাসেবা কর্মসূচিতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাহিনীকে জনগণের আরও কাছে নিয়ে এসেছে এবং জন-আস্থার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছে।’
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর যে বিরল সক্ষমতা এই বাহিনীর রয়েছে, তা প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। ভবিষ্যতে আনসার-ভিডিপির ৬০ লক্ষাধিক সদস্য ও তাদের পরিবারসহ প্রায় তিন কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আনসার-ভিডিপি একাডেমির হাসপাতালকে এই কার্যক্রমের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ কমান্ডার ড. মো. সাইফুর রহমান জানান, সাতটি জেলার ১৫টি মেডিকেল ক্যাম্পের জন্য সেইসব এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে মানুষের চিকিৎসাসেবা সীমিত। তিনি বলেন, ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ চিকিৎসা, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং চক্ষু চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সেবা দুর্গম এলাকায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা সুশাসনের জন্য প্রশাসন’ ধারণার একটি বাস্তব ও সফল প্রতিফলন।
বসুন্ধরার আদ্-দীন মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও নিউরোসার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, পোর্টেবল ল্যাব, জেনারেটর এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই চিকিৎসাসেবা প্রদানের মাধ্যমে আনসার-ভিডিপির মানবিক প্রশাসনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য হবে।
সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান মৃদুল’স কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মৃদুল হাসান বলেন, দুর্গম এলাকায় বিশেষ করে নারীদের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা ছিল অত্যন্ত আত্মতৃপ্তিদায়ক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি অনন্য অভিজ্ঞতা।
প্রথম পর্বের কর্মসূচির ফলাফল অত্যন্ত উৎসাহজনক। দেশের সাতটি জেলার—বগুড়া, জামালপুর, ভোলা, লালমনিরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা ও কক্সবাজার—প্রান্তিক এলাকায় মোট ৮,৭২৭ জন রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করেছেন। প্রতিটি মেডিকেল ক্যাম্পে আধুনিক হাসপাতালের মতো ৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট প্রদান করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে:
২১৯ জন রোগীর বিনামূল্যে চোখের ছানি অপারেশন, আনুমানিক বাজারমূল্য ৩২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
ইসিজি, সিবিসি ও কিডনি পরীক্ষাসহ প্রায় ৫৩ লাখ ১৫ হাজার টাকার ডায়াগনস্টিক সেবা।
প্রায় ১৩ লাখ টাকার ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণ।
প্রথম পর্বে আনসার-ভিডিপির পক্ষ থেকে মোট ১ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার ১০০ টাকার স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।
প্রতি ক্যাম্পে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি রোগী সেবা পেয়েছেন, যা প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার চাহিদা ও মানবিক সহায়তার গুরুত্বকে প্রমাণ করে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী কেবল নিরাপত্তা রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং মানব নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে।
মহাপরিচালক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, এই ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ ভবিষ্যতেও সম্প্রসারিত হলে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।