ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় এখনো কোনো বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান না থাকায় সাধারণ মানুষ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নানাবিধ জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রবাসফেরত ব্যক্তি, বিদেশগামী সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থী, চিকিৎসা কিংবা ব্যবসায়িক কাজে যাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়, তারা ব্যাংকের মাধ্যমে নিরাপদ ও বৈধভাবে লেনদেন করতে পারছেন না। ফলে দ্রুতগতিতে অবৈধ লেনদেন বাড়ছে।
তপশিলি ব্যাংকগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার সুযোগ সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্যত অনুপলব্ধ থাকায় জনগণ বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেনে যুক্ত হচ্ছেন। এতে প্রতারণার ঝুঁকি, জাল নোট পাওয়ার সম্ভাবনা এবং অতিরিক্ত খরচের চাপ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, পার্শ্ববর্তী জেলা ও শহরগুলোতে বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজলভ্য হলেও গুরুত্বপূর্ণ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখনো তা নেই। এর ফলে জেলার মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অবৈধ লেনদেন বাড়ায় স্থানীয় অর্থনীতি এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সদর উপজেলার পীড়বাড়ি এলাকার বাসিন্দা মোবারক মিয়া জানান, তার ছোট ছেলে স্কলারশিপে ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছে। এক লাখ টাকার ডলার সংগ্রহের জন্য তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকটি ব্যাংকে গিয়েও পাননি। কয়েকটি দোকানেও চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে ফ্লাইটের দিন ঢাকায় গিয়ে একটি ব্যাংক থেকে অনেক কষ্টের বিনিময়ে ডলার জোগাড় করতে হয়েছে।
প্রবাসফেরত ব্যক্তিরা জানান, সঞ্চিত অর্থ দেশে আনতে তাদের প্রায়ই পার্শ্ববর্তী জেলা বা রাজধানী ঢাকায় যেতে হয়। এতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, বাড়তি খরচ হয় এবং সময় নষ্ট হয়। অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে অনেক সময় তারা প্রতারণার শিকার হন। ছোট ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বৈধ লেনদেনের সুযোগ না থাকায় তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং তারা অতিরিক্ত ঝুঁকিতে পড়ছেন।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের প্রবাসী গ্রাহকরা যেন সহজে ও নিরাপদে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করতে পারেন। কিন্তু এখনো এখানে কোনো বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ নেই। ফলে বাধ্য হয়ে অবৈধ চ্যানেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।’
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা হওয়া সত্ত্বেও এখানে বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ না থাকায় সাধারণ মানুষ অবৈধ লেনদেনে ঝুঁকছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, বরং দেশের জন্যও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, দ্রুত বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ চালু করা এবং তপশিলি ব্যাংকগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা জরুরি। এতে অবৈধ লেনদেন কমবে, মানুষ নিরাপদ ও স্বচ্ছভাবে লেনদেন করতে পারবে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
জেলা শহরের বাসিন্দা শামীম আহমেদ বলেন, বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ চালু হলে মানুষ সহজে, স্বচ্ছ ও ঝুঁকিমুক্তভাবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করতে পারবে। একই সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে নজরদারি বাড়বে এবং অবৈধ লেনদেনের প্রবণতা কমবে। তিনি বলেন, অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যবসায়ীর মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার নগদ লেনদেন এবং ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের সহজ প্রাপ্যতা ও ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
সচেতন মহল ও স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে জেলাবাসীর জন্য নিরাপদ ও বৈধ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। এতে শুধু সাধারণ মানুষই উপকৃত হবেন না, দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও রাজস্ব আদায়ও আরও সুসংহত হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা এখনো বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে পিছিয়ে থাকায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী-উভয়ই নানা সমস্যায় পড়ছেন। ঝুঁকিমুক্ত লেনদেন নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে অবৈধ লেনদেন আরও বাড়বে এবং জেলা ও দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই একমাত্র সমাধান বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখানে বৈধ মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা নেই, বিষয়টি আগে জানতে হবে। জেনে তারপর বিস্তারিত বলা যাবে। ব্যাংকগুলোর সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলব এবং খোঁজখবর নেব।’